মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত : বোরো ধান তলিয়ে গিয়ে ২০০ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা: স্থানীয় চাষীরা হতাশায়

April 5, 2017,

এস এম উমেদ আলী॥ ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাকালুকি হাওরের উঠতি ফসল বোরো ধান তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কয়েক দিন ধরে ঢলের পানিতে তলিয়ে থাকায় ধান গাছ পচে নষ্ট হচ্ছে। পূরো বছরের খাবার ও জীবিকা নির্ভর করে হাওরের ফসল সুষ্টু ভাবে ঘরে তোলার উপর। স্থানীয় চাষীরা এ বছর বোরো ধান ঘরে তোলতে না পেরে পরেছেন হতাশায়। তার পরও অনেক কৃষক পানির নীচে তলিয়ে থাকা কাঁচা ধান কেটে ঘরে তুলছেন।
কুলাউড়া, বড়লেখা, জুড়ী, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলার বিস্তৃত অংশ নিয়ে হাকালুকি হাওর। এ সব এলাকার কৃষকরা যখন বাম্পার ফলনের আশায় পাকা ধান কাটার চিন্তা করছেন ঠিক সেই সময় পাহাড়ী ঢলে বোরো ফসল ৮ থেকে ১০ ফুট পানিতে তলিয়ে যায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিপাতে জুড়ী, ফানাই, কন্টিনালা ও সোনাই নদী দিয়ে হাকালুকি হাওরে হঠাৎ ঢলের পানি


টানা তিন দিনের অবিরাম বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে মৌলভীবাজার জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জেলার হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, কাউয়াদিঘি হাওর সহ ছোট বড় কয়েকটি হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। হেক্টরের পর হেক্টর পাকা ও আধ পাকা বোরোধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হাওর পাড়ের কৃষক।
হাকালুকি,কাউয়াদিঘি,হাইলহাওর পাড়ের কৃষকরা একমাত্র ফসল বোরোধান চোখের সামনে হারিয়ে যাওয়ায় নি:স্ব হয়ে পড়েছেন তারা। পরিবার পরিজন নিয়ে তারা দুবেলা দু’মুঠো ভাতের নিশ্চয়তায় এখন তারা উদ্বেগ উৎকন্ঠায়।
টানা ভারী বর্ষণের ফলে মৌলভীবাজার শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। স্কুল,কলেজ ও অফিসগামি লোকজন হঠাৎ টানা বৃষ্টির কবলে পড়ে চরম দূর্ভোগে পড়েছেন। শহরের পশ্চিম বাজার, ফাটাবিল, কাশিনাথ রোড়, সৈয়ারপুর, শান্তিভাগ, পশ্চিম ধরকাপর ও বড়কাপন এলাকার বাসিন্ধারা জলাবদ্ধতায় দূর্ভোগে পড়েন। ওই এলাকার লোজন তাদের বাসা বাড়ি ও সড়কে হাটু পানি দিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশন ও সাতগাঁও স্টেশনের মধ্যবর্তী ভোজপুর এলাকায় প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের স্রোতে রেলওয়ে ব্রীজের এটি গর্ডার ধ্বসে সিলেটের সাথে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। শ্রীমঙ্গল রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আলী আজম জানান ভারী বর্ষন ও পাহাড়ী ঢলে শ্রীমঙ্গল উপজেলার পাহাড়ী এলাকার ভোজপুর এলাকায় রেলওয়ের ১৪১ নং ব্রীজটির মুল গার্ডারের নিচের মাটি সরে দেবে গেলে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়। ব্রিজ মেরামতের কাজ চলছে রাত ১০ টার মধ্যে ব্রিজ মেরামত শেষে এটি চালুর কথা রয়েছে।


বোরো ধানের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জানতে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ পরিচালক মোঃ শাহজানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন টানা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার প্রতিটি হাওরে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমরা সরজমিনে মাঠ পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান নিরুপন করার চেষ্ঠা করছি। প্রাথমিক ভাবে যার আর্থিক হিসেবে ক্ষতির পরিমান প্রায় ২০০ কোটি টাকা হতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, সদর উপজেলার কাঞ্জার হাওর, মানিক হাওর, হাইল হাওর ও কাউয়াদিঘি হাওর পানির নিছে তালিয়ে গেছে। সদর উপজেলায় ৬২৫ হেক্টর, শ্রীমঙ্গলে ৩০৭ হেক্টর, রাজনগরে ১৩৬৫ হেক্টর, কমলগঞ্জে ৩০০ হেক্টর, কুলাউড়ায় ৪৫০০ হেক্টর, জুড়ীতে হেক্টর ৪৬৫০ হেক্টর, বড়লেখায় ৩৪১৫ হেক্টর সহ মোট ১৪৮৬২ হেক্টর বোরো ধান তলিয়ে গেছে।
এ ছাড়াও কমলগঞ্জে ৫০ হেক্টর ও বড়লেখায় ৩০ হেক্টর সবজি তলিয়ে গেছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বিজয় ইন্দ্র শংঙ্কর চক্রবর্তী জানান জেরার মনু,ধলাই,ফানাই,বিলাস ও জুড়ী নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এখোনও বিপদ সীমার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বর্ষণ অব্যাহত থাকলে নদ নদীর পানি বৃদ্ধি হয়ে আগাম বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশংঙ্কা রয়েছে।
কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নের আইপিএম কৃষক ক্লাবের সভাপতি মোঃ এনামুল হক জানান, তার ২৫ বিঘা জমি কাঁচা ধান প্রায় ১০ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পহেলা বৈশাখে এ এলাকায় নবান্ন উৎসব হতো হাওর পারের এই রাস্তার উপর। কিন্তু এ বছর আর নবান্ন উৎসবের আমেজ না পারয়ার সম্বাবনা শতভাগ রয়েছে। তিনি আরো কোন কৃষক পাঁকা এক মুটো এখোনো ঘরে উঠাতে পারেনি।
বেশির ভাগ কৃষক বিভিন্ন ব্যাংক, সমিতি ও ব্যক্তির কাছ থেকে ঋণ এনে জমি চাষাবাদ করেছেন। কিন্তু ধান পানির নিছে তলিয়ে যাওয়া কিভাবে মানুষের ঋণ পরিশোধ করবেন আবার কিভাবে সংসার চালাবেন এনিয়ে দুঃশ্চিন্তায় রয়েছেন।
বাদে ভুকশিমইল গ্রামের ইসালম উদ্দিন, কাসেম আলী, দেলওয়ার হোসেন সুজন, মদরিস আলী, আনোয়ার হোসেন সুমন জানান, বোরো ধান ঘরে তোলে পূরো বছরের খাবার সহ জীবীকা অর্জনের একমাত্র নির্ভরতা এই ফসলের উপর।
কৃষক কালা মিয়া বলেন, ভাই গ্রামীণ অফিস থেকে ঋণ নিয়ে অন্যের জমি চাষ করেছিলাম কিন্তু সব ধান পানির নিছে তুলিয়ে গেছে। এখন ৬ সদস্য বিশিষ্ট পরিবার কিভাবে চালাব চিন্তা করে কুলকিনারা পাচ্ছিনা।
কৃষাণী জয়তুন বিবি বলেন, বোরো ফসল দিয়ে আমাদের সংসার ও ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া খরচ চালাতাম কিন্তু এখন কিভাবে বাচ্চাদের মুখে ভাত দিব ভেবে পাচ্ছিনা।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com