হাকালুকি হাওর ডুবছে বোরো কাঁদছে কৃষক

April 8, 2017,

ইমাদ উদ দীন॥ হঠাৎ টানা বৃষ্টিতে আমাদের সব কেড়ে নিল। সারা বছরের সম্বল চোখের সামনেই ডুবে গেল। বাবা আমাদের সব শেষ। এবছর পরিবার পরিজন নিয়ে খাব কি। সংসার চালাব কি করে। বাবা সরকারকে আমাদের অসহায়ত্বের কথা জানাও। হাকালুকি হাওরের বোরো চাষী আছর উল্লাহ (৭৫),রজব আলী (৫৮),আমির আলী (৬০),ইসুব আলী (৬৫),সুনিল দাস (৫০) সহ অনেকেই ডুবে যাওয়া ক্ষেত দেখিয়ে তাদের এমন দূর্দশার কথা বলেন। স্বপ্নের সোনালী ফসল বোরো ধান হারিয়ে এখন তারা বির্পযস্ত। পুরো বছরের জীবীকার এই ফসল হারিয়ে এখন তারা চরম হতাশায়। জানা গেল ওই চাষীদের মধ্যে কেউ ২৫ বিঘা,কেউ ৩০ বিঘা,১০ বিঘা কেউ ৮বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। আবার অনেকেই নিজের জমিজমা না থাকায় বর্গা নিয়ে করেছিলেন বোরো চাষ। বিঘা প্রতি ৫-৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল তাদের। স্বপ্ন ছিলো বাম্পার ফলনের। কিন্ত অকাল বন্যায় সবশেষ।
হাকালুকি হাওর পাড়ের কাড়েরা,ছকাপন ও বাদে ভূকশিমইল এলাকায় গেলে বৃষ্টির মধ্যেও জটলা বেঁধে কৃষকরা কান্নাজড়িত কন্ঠে তাদের কষ্টের কথা গুলো জানান এই প্রতিবেদকের কাছে। এখন পুরো হাকালুকি হাওর জুড়ে কৃষকের হাহাকার। চোখের সামনে তলিয়ে গেছে তাদের স্বপ্নের ফসল বোরো। হাওর পাড়ের মানুষের একমাত্র ফসল বোরো ধান এখন ৪-৫ ফুট পানির নিচে। প্লাবিত হচ্ছে একের পর এক নতুন এলাকা। টানা তিন দিনের ভারি বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে থোড় দেওয়া ও আধপাকা বোরো ধান হারিয়ে দিশেহারা বোরো চাষীরা। মৌলভীবাজারের বোরো ধান চাষের জন্য বিখ্যাত হাকালুকি হাওরের মত একই অবস্থা কাউয়াদিঘি আর হাইল হাওরেরও।ওখানেও থামছেনা কৃষকের কান্না।হাওর পাড়ে বসে বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখছেন আর ঢুকরে কাঁদছেন।বছর জুড়ে জীবীকা নির্বাহের একমাত্র ফসল হারিয়ে এখন তারা নির্বাক। সরেজমিন হাকালুকি হাওর পাড়ের কুলাউড়ার কাড়েরা,কানেহাত,কালেশার,ছকাপন,বড়ধল,বাদেভুকশিমইল,কুরবানপুর,শাহাপুর,গৌড়করণ,মুক্তাজিপুর ও জুড়ি উপজেলার জায়ফরনগর ও পশ্চিম জুড়ি,বড়লেখা উপজেলার তালিমপুর ইউনিয়ের কয়েকটি এলাকার ঘুরে দেখা গেল থোড় বের হওয়া অবস্থায় হেক্টরের পর হেক্টর বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কয়েকটি এলাকায় দেখা গেল বাড়ির পাশে থাকা এমন ধান দ্রুততার সাথে কাটছেন কয়েকজন কৃষক। জানতে চাইলে চাষীরা বললেন এই থোড় ধান গুলো গরু ও মহিষের খাদ্য হবে। কিছু সময় গেলে এগুলোও পানিতে তলিয়ে যাবে। তাই বলতেন পারেন পানির সাথে যুদ্ধ করেই এগুলো কাটছি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সুত্রে জানা যায় তিন দিনের টানা ভারী বর্ষণে জেলায় মোট ১৪,৮৬২ হেক্টর বোরো ফসল ও ৮০ হেক্টর সবজির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। তন্মেধ্যে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর বোরো ফসলের জমি হাকালুকি হাওর এলাকার। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টি না থামলে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমান আরো বাড়বে। ভূকশিমইল আইপিএম কৃষি ক্লাবের সভাপতি মো: এনামূল হক, সদস্য দেলোয়ার হোসেন সুজন,আব্দুল মুমিন জানু,ইসলাম উদ্দিন,কদম আলীসহ ওই এলাকার কৃষকরা জানান, আর মাত্র ১৪-১৫ দিনের মধ্যে ফসল কাটা শুরু হতো। এবছর প্রথম দিকে আবহাওয়া বোরো চাষের অনুকুলে থাকায় বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা ছিল। প্রতি বছরের মত এবছরও তারা বোরো ধান ঘরে তুলাকে কেন্দ্র করে নবান্ন উৎসবের আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।কিন্তু তিন দিনের টানা ভারী বর্ষণে তাদের সব স্বপ্ন শেষ। একমুঠো ধান কৃষকরা ঘরে তুলতে পারেন নি। তাই এবছর তাদের পরিবারে জীবন জীবীকা নিয়ে উদ্বিগ্ন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপ পরিচালক মো: শাহজান বলেন এ ক’দিনের থেমে থেমে ভারী বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে এজেলার হাওর অঞ্চলের বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি সবজি ক্ষেতেরও ক্ষতি হয়েছে। এবছর জেলায় বোরো ধানের বাম্পার ফলের প্রত্যাশা ছিল। প্রাথমিক ভাবে আমরা এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমান ২শ কোটি টাকা হবে বলে ধারণা করছি।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com