অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলে তলিয়ে গেছে বোরো ধান : এবার নতুন ধানের পিঠা দেয়া হবে না মেয়ের বাড়িতে : নেই নবান্ন উৎসব

April 11, 2017,

হোসাইন আহমদ॥ অতিথিপরায়ন সিলেট বিভাগে একটি অলিখিত রেওয়াজ ছিল নবান্ন উৎসবে নতুন ধান ঘরে তুলে সেই ধানের চাল দিয়ে মেয়ের বাড়িতে মা-আত্মীয় স্বজনরা নিজ হাতে তৈরি করে পিঠা পাঠাতেন। কিন্তু এবার বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে আর মেয়ের বাড়িতে নতুন ধানের পিঠা পাঠানো হবে না। কারণ ওই এলাকার প্রায় সব হাওরের বোর ধান গত দু-এক দিনের ব্যাবধানে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলে পানির নিছে তুলিয়ে গেছে।
উজান এলাকায় কিছু ধান তলিয়ে না গেলেও এটা সংখ্যায় ২০ শতাংশেরও কম। প্রায় ৮০ শতাংশ জমি তালিয়ে গেছে। এ অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।
জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সদর উপজেলার ১০৪২৫ হেক্টের জমির মধ্যে ৯৫০ হেক্টর, শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৯৫৬৬ হেক্টের জমির মধ্যে ১১৯৭ হেক্টর, রাজনগর উপজেলার ১৩২০০ হেক্টের জমির মধ্যে ১৯৫০ হেক্টর, কমলগঞ্জ উপজেলার ৩৮৭৫ হেক্টের জমির মধ্যে ৪০০ হেক্টর, কুলাউড়া উপজেলার ৬৫৫০ হেক্টের জমির মধ্যে ৪৫০০ হেক্টর, বড়লেখা উপজেলার ৪৩৪০ হেক্টের জমির মধ্যে ৩৬৮৫ হেক্টর এবং জুড়ী উপজেলার ৫৪৭০ হেক্টের জমির মধ্যে ৪৭৫০ হেক্টরসহ সর্বমোট ১৭ হাজার ৪শ ৩২ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে।


প্রতি বছর নবান্ন উৎসবে এ জেলার প্রতিটি বাড়ির উঠানে পালাগান, জারিগান, সারিগান ও বাউল গানের আসর বসানো হতো। শিল্পীরা আপন মনে সূরালো কন্ঠে গান পরিবেশন করতে। গান শোনার জন্য শহর থেকে অনেক লোক গ্রামের যেতেন। শহরের অধিকাংশ পরিবার আনন্দ উৎসব করতে কিছু দিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বেড়াতে যেতেন। ব্যাপক আনন্দে উদ্দীপনায় কাঁটা হতো বোরো ধান। বিভিন্ন এলাকা থেকে দিনমজুররা এসে জমির মালিকদের বাড়িতে থেকে খাওয়া-দাওয়া করে ধান কাঠতেন। এযেন ছিল আরেকটি মহাউৎসব। কিন্তু এবার মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। তারা মেয়ের বাড়িতে পিঠা দেয়া তো দূরের কথা দু-বেলা দু-মুট ভাত খাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
দাদীরা নাতিন/নাতনিদের জন্য নিজ হাতে পিঠা তৈরি করতেন। পিঠার মধ্যে ছিল ভাপা পিঠা, খেজুরের রস পিঠা, শাহী পিঠা, খোলা চিতই, দুধ চিতই, সিদ্ধ কুলি পিঠা, বাজাকুলি পিঠা, ছানারপুলি, দুধপুলি, নারিকেলের পিঠা, সুন্দরী পাখন পিঠা, খির পিঠা, মেরা পিঠা ও বিবিখানা পিঠ ইত্যাদি।
সরেজমিন হাকালুকি হাওরে গেলে কথা হয় কৃষাণী ফেরদৌস আরা নামের এক মহিলার সাথে তিনি বলেন, প্রতি বছর নতুন ধান তুলে সেই ধানের চাল দিয়ে মেয়ের বাড়িতে নিজ হাতে তৈরি পিঠা পাঠাতান। কিন্তু এবার আর তা হবে না।
সদর উপজেলার গিয়াসনগর ইউনিয়নে কৃষক মোঃ মতলিব বলেন, পিঠা খাওয়া তো দূরের কথা এখন ছেলে সন্তানদের নিয়ে কিভাবে পরিবার চালাবো চিন্তা করে পারছিন। একই কথা বলেন, কৃষাণী, আফিয়া বেগম, ফজলে কবির, মোঃ মতলিব, খোদেজা বেগম ও কলি বেগম।
অদিকাল থেকে অঞ্চলের কৃষকেরা ধান গোলায় তুলে তৃপ্তির হাঁসি দিত। গোলায় ধান দেখেই কৃষকরা সারা বছরের হাড়ভাঁঙ্গা পরিশ্রমের কথা ভুলে যেতেন। কিন্তু এবছর আর সেই হাঁসি নেই কৃষকের মুখে। পিটা-পুলির উৎসব হবে কিভাবে। এমন প্রশ্ন বিরাজ করছে সকলের মুখে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com