হাওর তীরের অসহায় মানুষের প্রতীক্ষা

May 22, 2017,

ইমাদ উদ দীন॥ জেলার হাকালুকি,কাউয়া দিঘি ও হাইল হাওর। আর মনু,ধলাই,সুনাই ও জুড়ী নদী। একই অবস্থা জেলার হাওর ও নদী তীরবর্তী কৃষি ও মৎস্যজীবী মানুষের। এবছর বোরো ধান,মাছ আর মৌসুমী সবজির ফসল হারিয়ে সর্বস্বান্ত। আগাম বন্যার প্রায় দেড় মাস অতিবাহিত হলেও শুধু প্রশ্রিুতির ফুলঝুড়ি ছাড়া এখনো মিলছেনা পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা। তাই সরকারী বেসরকারী সহায়তার প্রত্যাশায় এখন প্রতীক্ষায় হাওর তীরের অসহায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ।এবছর চৈত্রের অকাল বন্যায় সব হারিয়ে চরম অসহায় এ জেলার হাওর আর নদী তীরের মানুষ।ধান নেই,মাছও নেই। পানি দূষিত হয়ে মরেছে জলজ প্রাণী আর পোষা হাঁসও। খাদ্য আর বাসস্থান সংকটে বিক্রি করেছেন গৃহপালিত পশুও।একে একে বেচেঁ থাকার সব উপকরন এখন হাতছাড়া হওয়ায় তারা হতাশ।তাই এবছর পরিবার পরিজন নিয়ে খাওয়া বাচাঁর চিন্তায় চরম উদ্বেগ উৎকন্ঠায় হাওর পাড়ের বাসিন্ধারা।এবছর তাদের এমন বিড়ম্বনায় ফেলেছে এই হাওর ও নদী। হঠাৎ রাক্ষুসী হয়ে হাওর ও নদী গিলে খেয়েছে তাদের জীবন জীবীকা চলার সব সম্পদ। এটা তাদের ভাগ্য বিড়ম্বনা হলেও কম দায়ী নয় সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা। প্রতিবছরই হাওর থেকে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় হলেও এর উন্নয়নে নেননি কোন মহাপরিকল্পনা। এমনকি দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি হাওর উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায়ও স্থান পায়নি। দীর্ঘদিন থেকে সংস্কার না হওয়ায় স্থানীয় এই নদী ও হাওরে পানির ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় বর্ষায় বন্যা আর শুষ্ক মৌসুমে ধূ ধূ মরুভূমি। ক্ষতিগ্রস্থরা জানালেন নাব্যতা হ্রাসে এখন প্রতিবছরই স্থানীয় হাওর ও নদী তাদের প্রতি এমন নির্দয় হলেও এবছর ঘটেছে চূড়ান্ত বির্পযয়। অনান্য বছর হাওর ও নদী পাড়ের চাষীরা অধিকাংশ বোরো ধান আর রবি শস্য ঘরে তুললেও এবছর ঘটেছে ব্যত্যয়। হঠাৎ ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে আসা পাহাড়ী ঢল তলিয়ে দিল তাদের বছর জুড়ে খাওয়া বাঁচার একমাত্র স্বপ্নের সোনালী ফসল বোরো ধান।এমন বির্পযয় এর আগে কখনো দেখেনি এ অঞ্চলের হাওর এলাকার মানুষ। সব হারিয়ে এমন দূর্যোগ মোকাবেলায় এখন দিশেহারা হাওর তীরের বাসিন্ধারা। জানা যায় হাওর তীরের লোকজনের জীবন জীবীকা একমাত্র  ফসল বোরো ধান কে ঘীরে। বোরো ধান ঘরে তুলা শেষ হলে তারা হাওরের মাছ ধরে খরচ যোগায় সংসারের।  কিন্তু এবছর তাদের চোখের সামনেই সবই বিলিন হল আগাম বন্যার পানিতে। মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন সুত্রে জানা যায় জেলায় অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থের সংখ্যা প্রায় ৪ লক্ষ। বর্ষা মৌসুমের সবজির ফসলের ক্ষতির পরিমান প্রায় ৭০১ হেক্টর। টাকার মূল্যে এই ক্ষতির পরিমান ২৭-২৮ কোটি টাকা। বোরো ফসলের ক্ষতি ১৭হাজার ৪শ’৩২ হেক্টর। যা টাকার মূল্যে (৩২ টাকা চালের দর হিসেবে) ১শ’ ১৩ কোটি ৬৫ লক্ষ টাকা । ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন প্রায় ৪০ হাজার কৃষক। জলজ প্রাণীর ক্ষতি প্রায় ২৮ কোটি টাকা। শুধু হাকালুকি হাওরে মারা গেছে ২৫ হাজার মেট্রিকটন মাছ। তবে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমান চূড়ান্ত করতে সংশ্লিষ্টদের চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ আর পরিমানের হালনাগাদ। সরকারী সহায়তা হিসেবে এ পর্যন্ত জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্থ উপজেলাগুলোতে তৃতীয় দফা ত্রাণ সহায়তা দিলেও তা ছিলো একেবারেই অপ্রতুল। এই তিন দফা ত্রাণ সহায়তার মধ্যে ছিলো চাল ও নগদ টাকা। জানা যায় জেলার ৪ লক্ষ ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য বরাদ্দ ছিলো ১ হাজার ভিজিএফ কার্ড ও নগদ ৫০০টাকা। ক্ষতিগ্রস্থ ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা জানান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য এ যাবত যে সরকারী সহায়তা এসেছে তা চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। হাওর তীরের কম সংখ্যক মানুষ এই সহায়তা পেলে বেশি সংখ্যক লোকজন এই ত্রাণ সহায়তা থেকে হয়েছেন বঞ্চিত।এখন চলছে ওএমএসের চালের মাধ্যমে সরকারী সহায়তা। নায্য মূল্যের নির্দিষ্ট দোকানে প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার ১৫ টাকা দরে প্রতিদিন পাচ্ছেন ৫ কেজি ওএমএসের চাল।

 

একজন ডিলার প্রতিদিন ২০০ জনের কাছে এই চাল বিক্রি করতে পারবেন।এ সহায়তা চলবে একমাস। জানা যায় হাকালুকি হাওরের কুলাউড়া,জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় মোট ১৪ জন ডিলারের মাধ্যমে ওএমএসের চাল বিক্রির কার্যক্রম চললেও তা ক্ষতিগ্রস্থদের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। প্রতিদিন ২ হাজার ৮শ লোক এই সহায়তা পেলেও লাইনে দাঁড়িয়ে চাল না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন প্রায় ৬-৭ হাজার মানুষ। জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তা বাড়ানোর চাহিদার বিষয়টি তারা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। তবে এখনো আসেনী চাহিদার সেই ত্রাণ সহায়তা। হাওর পাড়ের ক্ষতিগ্রস্থরা জানান তারা সরকারী কিংবা বেসরকারী কোন সংস্থারই ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছেন না বললেই চলে। কারন এপর্যন্ত আসা সরকারী সহায়তা গুলো তাদের এলাকার কম সংখ্যক লোক পেলেও অধিকাংশই পানানি এই সহায়তা। তারা জানালেন ২০১০ সালের দিকে বন্যা হলে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক,সামাজিক,সাংস্কৃতিক,ক্রীড়া সংগঠন,ধনাঢ্য ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসলেও এবছর এখন পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে তেমন সাড়া নেই ত্রাণের। অথচ এমন ভয়াবহ বির্পযয় এর আগে কখনো মোকাবেলা করতে হয়নি এ অঞ্চলের হাওর ও নদী তীরের কৃষি ও মৎস্যজীবী মানুষের। গতকাল সরজমিন হাওর ও নদী তীরবর্তী এলাকায় গেলে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্থরা ত্রাণের জন্য এমন মানবিক আবেদন জানান। হাকালুকি হাওর পাড়ের বাসিন্ধা বৃদ্ধ তৈইমুছ আলী (৬৫), ছানা মিয়া (৭০),আয়ছর আলী (৫৮), লিচু মিয়া (৬০),গুলজার মিয়া (৭০) বলেন সরকারের পাশাপাশি যদি অনান্যরা ত্রাণ সহায়তা না নিয়ে আসেন তা হলে আমাদের পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে। আমরা কখনো সরকারী বা বেসরকারী সহায়তার অপেক্ষায় থাকিনা। আমরা সবসময়ই আমাদের পরিশ্রমের আয় উর্পাজন দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে খেতে চাই। কিন্তু এবছর প্রকৃতি আমাদের উপর সহায় না হওয়ায় আমাদের সারা বছরের খাওয়া বাচাঁর অন্যতম উৎস বোরো ফসল তলিয়ে নিয়ে গেছে। আমাদের দূর্দিন যাচ্ছে। এসময় আমাদের পাশে দাঁড়ালে আমরা বেঁচে থাকার মনোবল পাব। তাই সকল বৃত্তবানদের প্রতি আমাদের আকুল আবেদন আমাদের প্রতি আপনারা সাহায্যের হাত বাড়ান।  অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ জেলার হাওর ও নদী তীরের দূর্গত অসহায় মানুষের সুখ দু:খের খবর নিতে গেলে সংবাদ কর্মী পরিচয় পেয়ে তারা জানতে চান ভাই ওরা কই (কোথায়)? ওরা আসছেন না কেন। আমাদের দু:খের কথা তাদের জানান। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যাশা আমাদের এমন দু:খ দূর্দশার কথা জানলে অন্যবারের মত এবারো তারা আমাদের পাশে (ত্রাণ সহায়তা নিয়ে) এসে  দাঁড়াবেন। তবে একেবারেই যে বেসরকারী সংস্থা, ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসছেন না এমনটি নয়। সম্প্রতি ঢাকাস্ত মৌলভীবাজার সমিতি, মৌলভীবাজার একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তানভীর’স এন্টারপ্রাইজ ও ছাত্র ইউনিয়ন মৌলভীবাজার জেলা শাখা হাকালুকি হাওর তীরের ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী ও নগদ অর্থ বিতরন করেছেন বলে স্থানীয় বাসিন্ধারা জানিয়েছেন। তবে তা ক্ষতিগ্রস্থদের তুলনায় অপ্রতুল। তাই ওদের দূর্দিনে সকলের সম্মেলিত সহযোগীতার প্রচেষ্ঠার প্রয়োজন বলে জোর দাবী স্থানীয় সচেতন মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com