ভালো নেই হাওরপাড়ের মৎস্যজীবীরা : জাল আছে মাছ নেই

ইমাদ উদ দীন॥ ঘরে চাল নেই। তেল নূন মরিচও নেই। অর্ধহারে অনাহারে দিন কাটছে হাওর তীরের জেলে পরিবারের। এখন আয় রোজগার না থাকায় অভাব অনটনেরও শেষ নেই। চলছে চরম দূর্দিন। এবছর ধান নেই। মাছও কম। সবই হারিয়ে নি:স্ব হাওর তীরের কৃষি ও মৎস্যজীবী মানুষ। এখন মাছের ভর মৌসুম। কিন্তু জেলেরা হাওরে জাল ফেলে হচ্ছেন হতাশ। কারন মিলছেনা আশানুরুপ মাছ। তাছাড়া ভাসমান পানিতে মাছ ধরা নিয়েও রয়েছে নানা বাধা বিপত্তি। যে এলাকাতে জালে কম বেশি মাছ ধরা পড়ছে সে খানে মাছ ধরতে দিচ্ছেন না বিল ইজারাদার। বিলের আশপাশ ভিড়লেই নানা বিড়ম্বনা। দূর্ভোগগ্রস্থরা জানালেন এবছর হঠাৎ উত্তাল হাওর রাক্ষুসে হয়ে সবই গ্রাস করেছে হাওর। তাই বোরো চাষীদের মত দূর্দিনে হাকালুকি হাওর তীরের মৎস্যজীবীরাও। এ সংকট কাটাতে নেই তাদের সহায় সম্বল। প্রতিদিনই নানা জনের আশার বাণী আর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিই তাদের শান্তনা। দীর্ঘ প্রতীক্ষা তারপরও মিলেনা সে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। তাই তাদের এখনকার বাস্তবিক দৃশ্য বড়ই করুণ। আশানুরুপ কোন সহায়তা এখনো জুটেনি তাদের। দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা নেই। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে তাদের। বেঁচে থাকার সংগ্রামে প্রতিদিনই আগের মত ছুটে চললেও তা হচ্ছে অসার। কারন এবছর হাওর হারিয়েছে তার জৌলুস। আয় রোজগার নেই। তাই পরিবারের খাওয়া বাঁচা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ উৎকন্ঠা। এমন দুশ্চিন্তায় এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন।
স্থানীয় মৎস্যজীবীরা জানালেন মড়কের পর জালে মাছ ধরা পড়ছে কম। অকাল বন্যা আর চলমান বর্ষণে এখন পানিতে টইটুম্বর হাওর হাকালুকি। অনান্য বছর এসময় নানা জাতের দেশীয় প্রজাতির মাছ জালে ধরা পড়লেও এবছর ভিন্ন চিত্র। সারা দিন জাল ফেলেও মিলছেনা পর্যাপ্ত মাছ। তারপরও পরিবারের জীবীকার প্রয়োজন, অলস সময় আর নেশার টানে ভাসমান নতুন পানিতে জাল ফেলছেন মৎস্যজীবীরা। কিন্তু অনেকটা হতাশ হয়ে ফিরছেন বাড়িতে। যে হাওরকে উপলক্ষ করে চলে তাদের জীবন জীবীকা। সে হাওর এখন জীবিত থেকেও মৃত। তাই হাওর তীরের মানুষ গুলো এখন চরম অসহায়। এবছর চৈত্রের অকাল বন্যায় তাদের স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে। টানা ভারী বর্ষণ আর উজানের পাহাড়ী ঢল কেড়ে নিয়েছে তাদের সোনালী ফসল। বোরো ধানের পর মরছে মাছ। গবাদি পশু আর জলজপ্রাণী ও উদ্ভিদ। উত্তাল হাওর একে একে গিলে খেয়েছে সব সম্পদ। বসতভিটা ছাড়া এখন হাতে আর অবশিষ্ট নেই বেঁচে থাকার অবলম্বনের মত কোন সম্পদ। এমন দুঃসময়ে বেকারত্ব গুছাতে মিলছেনা অন্য পেশাও। তাই ঘুরে ফিরে মাছ ধরা আর বিক্রি করাই তাদের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পেশা। গতকাল সরজমিনে হকালুকি হাওর পাড়ের জেলে পল্লী হিসেবে পরিচিত কুলাউড়া উপজেলার ভূকশিমইল ইউনিয়নের তেঘরিঘাট,সাদিপুর, কুরবানপুর,মিরশংকর,বরমচাল ইউনিয়নের আলীনগর,জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের শাহপুর,ফতুনগর ও বেলাগাঁও এলাকায় গেলে কথা হয় স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সাথে। তারা কান্নাজড়িত কন্ঠে তুলে ধরেন তাদের অসহায়ত্বের কথা। তারা বলেন জন্মের পর এত বড় দূর্যোগ আর দেখেননি তারা। অনান্য বছর বন্যা হলেও কিছু ধানও ঘরে তুলতে পেরেছেন। বানের পানিতে ধান গেলেও প্রচুর মাছ পেয়েছেন। কিন্তু এবছর ভিন্ন। বোরো ধানের সাথে মরেছে মাছও। জেলে পল্লীর বাসিন্ধারা ক্ষোভের সাথে জানালেন এখন পর্যন্ত তারা সরকারী তরফে কোন সহায়তা পাননি। তারা বলেন আমাদের এমন চরম দূর্দিনে আশা ছিল সরকার আমাদের পাশে দাঁড়াবেন। সংকটময় এদূর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবেন। সরকারের তরফে এমন প্রতিশ্রুতি ফুলঝুরি শোনলেও এখন ক্ষতিগ্রস্থ মৎস্যজীবী হিসেবে আমরা কিছুই পাইনি। অকাল বন্যার পর হাওর পাড়ের মানুষের জন্য ওএমএস বা ভিজিএফের যে ত্রাণ সহায়তা এসেছিল তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল থাকায় ওই সহায়তাও আমাদের কপালে জুটেনি। এখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে গেলে তারা বলেন মৎস্যজীবীদের জন্য এখনো বরাদ্দ আসেনি আসলে পাবেন। তারা ক্ষোভের সাথে বলেন আমাদের এমন দূর্যোগ চলে গেলেও মনে হয় সরকারের ওই ত্রাণ সহায়তা আমাদের কাছে পৌঁছাবেনা।

হাকালুকি হাওরের তেঘরিঘাট এলাকার সেতুর পাশেই জাল,ডরি ও ফড়িয়া (মাছ ধরার ফাঁদ) পেতে মাছ ধরছিলেন সলিম মিয়া, হরমুজ আলী, আছই মিয়া। কেমন মাছ ধরা পড়ছে জানতে চাইলে তারা বলেন ভাই আগের মাছ নাই। এবছর মড়কের পর মাছ ধরা পড়ছে খুবই কম। সারা দিন মাছ ধরে ১০০ টাকারও মাছ পাইনা। এদিয়ে নিজে খাবকি আর পরিবারের সদস্যরা খাবে কি। তারা জানালেন মাছ যে একেবারেই নেই এমন নয়। সম্প্রতি ভারী বৃষ্টিতে নদী ভাঙ্গনে সৃষ্ট বন্যায় হাওরের তীরবর্তী এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে পুকুর ও মৎস্য খামারের মাছ প্লাবনের পানিতে ভেসে হাওরে আসে। এবছর ধান পচে প্রচুর খাবার থাকায় ওই মাছ গুলো হাওরের বিল এলাকায় চলে যাওয়াতে হাওরের তীরবর্তী ভাসমান পানিতে জালে মাছ ধরা পড়ছে কম। আর বিল এলাকায় মাছ ধরা পড়লেও ইজারাদারদের কারনে মাছ ধরাতো দূরের কথা নৌকা নিয়ে বিলের পাশ দিয়েও যাতায়াত করা কষ্টকর। হাওর পাড়ের ইসলামগঞ্জ বাজারের পশ্চিম পাশে মাছ ধরছিলেন কয়েকজন জেলে তারা জানালেন জমি বর্গা নিয়ে তারা চাষ করেছিলেন বোরো ধান। কিন্তু অকাল বন্যায় একটি ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। এখন জালে মাছও ধরা পড়ছে কম। অনান্য বছর ধান না থাকলেও মাছ ছিলো কিন্তু এবছর কিছুই নেই। তাই পরিবার পরিজন নিয়ে তারা দিশেহারা। হাওর পাড়ের স্থানীয় ইসলামগঞ্জ বাজার ঘাটে ও ঘাটের বাজারে প্রতিদিনই পর্যাপ্ত মাছ উঠলেও এবছর উল্টো চিত্র। আগেরমত নেই পাইকারী কিংবা খুচরা মাছ ক্রেতা বিক্রেতার হাকডাক। মড়কের পর পুঁটি,ট্যাংরা,মলা,কাশখয়রা আর ছোট চাঁদাজাতীয় মাছ ছাড়া জেলেদের জালে ধরা পড়ছেনা বড় মাছ। তাই স্থানীয় মাছের বাজার গুলোরও ক্রয় বিক্রয় কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে। স্থানীয় মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে এবছর হাকালুকি হাওরে মাছ মারা গেছে আনুমানিক ২৫ মেট্রিক টন। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে হাকালুকি হাওর তীরবর্তী এলাকায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ৪ হাজার। এবছর দূর্যোগের পর হাওরে মাছের ঘাটতি পোষাতে বিল নার্সারির (হাওর এলাকার বিল বা পুকুরে পোনা উৎপাদন) জন্য ২৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। অপরদিকে হাওরে রুই,কাতলা ও মৃগেল জাতীয় পোনা অবমুক্তের জন্য ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। চলতি মাসের মধ্যেই এসকল পোনা মাছ হাওরে অবমুক্ত করা হবে। কুলাউড়া উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. সুলতান মাহমুদ বলেন এটা সত্য হাওরের এই দূর্যোগের পর জেলেদের দূর্দিন যাচ্ছে। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন হাওরে পুঁটি, ট্যাংরা, মলাসহ ছোট মাছের পোনা দেখা যাচ্ছে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে হাওর থেকে মাছ বিলুপ্ত হয়নি। এবছর যে পরিমান খাদ্য সৃষ্টি হয়েছে তাতে দ্রুত মাছ বৃদ্ধি পাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। আশা করছি কিছু দিনের মধ্যে হাওরে জেলেদের জালে পর্যাপ্ত মাছ ধরা পড়বে। ভুকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো.আজিজুর রহমান মনির মানবজমিনকে বলেন,এখন পর্যন্ত মৎস্যজীবী হিসেবে আলাদা কোনো ত্রাণ দেওয়া হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সুত্রে জেনেছি ত্রাণ আসবে।



মন্তব্য করুন