১২ দিনে মাস মৌলভীবাজারে কোচিং বাণিজ্যে বেপরোয়া শিক্ষকরা মানছেন না মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা

September 18, 2017,

হোসাইন আহমদ॥ মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ, মহিলা কলেজ, সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, আলী আমজদ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কাশীনাথ আলাউদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজ, হাফিজা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও শাহ হেলাল উচ্চ বিদ্যালয়সহ মৌলভীবাজার জেলার শহর এবং গ্রামের প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা ও শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে প্রকাশ্যে কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের এই রমরমা বাণিজ্য। স্কুল ও কলেজের ক্লাসে সময় দেয়ার চেয়ে বাসায় ও কোচিংয়ে ব্যাচ পড়ানোই ওই সব শিক্ষকদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নামকাওয়াস্তে উপস্থিত হন ক্লাসে। শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করেন নিজের কাছে কোচিং পড়তে। আন্তরিকতার সহিত ক্লাসে পাঠদান না করায় বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষকের কাছে কোচিং পড়তে হয়। ওই সব শিক্ষকরা সপ্তাহে ৩দিন পড়িয়ে ১২ দিনে হয় তাদের মাস। জনপ্রতি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করেন ৬’শ থেকে ৮’শ টাকা পর্যন্ত। এনিয়ে সচেতন অভিবাবকদের মধ্যে চাঁপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। অধিকাংশ সময় কিছু অসাধু শিক্ষকরা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কোচিং নিয়েই ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কলেজের অভ্যন্তরীন ইনকোর্স ও ভাইবা পরীক্ষায় এবং স্কুলের পরীক্ষা গুলোতে নম্বর কম দেয়ার ভয় দেখিয়ে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করানো হয়।
ওই সব শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের পাশে বাসা ভাড়া নিয়ে অথবা অন্যের নামে কোচিং সেন্টার খোলে নির্বিঘেœ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের রমরমা বাণিজ্য। টাকার পিছনে সময় দেয়ায় শিক্ষকদের নৈতিক মানের অনেকটা অবনতি হয়েছে। যার কারণে শিক্ষার্থীরা তাদের কাছ থেকে কিছু শিখতে পারছেনা। মেধাহীন হয়ে উঠছে এ জেলার শিক্ষার্থীরা।
খোঁজ নিয়ে জানাযায়, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের ইংরেজি, গণিত, অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনা, রসায়ন, হিসাববিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ১২জন এবং সরকারি মহিলা কলেজের ইংরেজি, হিসাববিজ্ঞান ও বাংলা বিভাগের ৩জন শিক্ষক নিয়মিত রমরমা কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। কোচিং থেকে প্রতি মাসে তাদের শিক্ষার্থী ব্যধে ১/২ লক্ষ টাকা আয় হয়ে থাকে। আবার কারোও কারোও আরো অনেক বেশি আয় হয় বলে সূত্র জানায়। জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষকদের এমন বাণিজ্যে হতবাক এ জেলার অভিবাবকরা। অনেক অভিবাবক শিক্ষার্থীকের ফেল করে দেয়ার ভয়ে মুখখোলে কিছু বলতে সাহস পাচ্ছেন না।
সরেজমিন মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগরে প্রভাষক মোঃ মশিউর রহমান এর বাসায় গেলে দেখা যায়, ২০/২২ জনের একটি ব্যাচ পড়াচ্ছেন। সূত্র জানায় তিনি মাসে ১০০/১৫০ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন ব্যাচে জনপ্রতি ৬’শ টাকা করে কোচিং পড়ান। ওই বিভাগে প্রভাষক মাহমুদুল হাসান শাহীও নিয়মিত কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আবু হানিফ সকাল ৮টা থেকে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর শতাধিক শিক্ষার্থী এবং দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যার পূর্বমূহুর্ত পর্যন্ত বিভিন্ন সময় একাধিক ব্যাচে অনার্স ও মাষ্টার্স এর আরোও কয়েকশ শিক্ষার্থীদের কোচিং পড়ান। কোচিং পড়ানোই উনার প্রধান নেশা। ইংরেজী বিভাগের প্রভাষক দিপালকও বাসায় শিক্ষার্থীদের পড়ান বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক মোঃ জিয়াউর রহমান সর্বদা কোচিং নিয়েই ব্যস্থ থাকেন। উনার কাছে সপ্তাহে ৩দিন এবং ১২ দিনে মাসে দিতে হয় ৮’শ টাকা। এইচএসসি, অনার্স ও মাষ্টার্সের বিভিন্ন বর্ষের প্রায় ৭’শ শিক্ষার্থী প্রতি মাসে ওই শিক্ষকের কাছে কোচিং পড়তে আসে। কলেজ ও মন্ত্রণালয়ের নীতিমালাকে তোয়াক্কা না করে বীরের মতো চালিয়ে যাচ্ছেন উনার বাণিজ্য। তিনি বছরের শুরুতে কোর্ট এলাকার শাকুরা মার্কেটের দক্ষিণ পাশে একটা কোচিং সেন্টার চালু করে ছিলেন। পরবর্তীতে ৩ মাসের মাথায় এটা আবার বন্ধ করে বাসায় পড়ানো শুরু করেন। ঊনার ব্যক্তিগত ফেইসবুক আইডিতে গিয়ে দেখা যায়, ফেইসবুকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কোচিং এর সময় ও অনুষাঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে অবগত করেন। ওই বিভাগের শিক্ষক প্রভাষক মহি উদ্দিনও উনার বাসায় ব্যাচ করে নিয়মিত কোচিং পড়ান বলে সূত্র জানায়।
এদিকে মহিলা কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পার্থ প্রতিম চক্রবর্তী, হিসাবজ্ঞিান বিভাগের রেজাউল করিম জনি কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।
কাশীনাথ আলাউদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজের গণিত শিক্ষক সুব্রত পাল, ইংরেজি শিক্ষক মুহিবুল হাসান, বিজ্ঞানের শিক্ষক আব্দুর রউফ, মনিরুজ্জামান, নোমান আহমদ ও আবু সায়েম। সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজ কুমার, জুতি লাল সূত্রধর, সুজিত সিংহ, আশরাফ মুহিত, সুরেন্দ্র কুমার দে, গণিত শিক্ষক মোস্তাক আহমদ ও আব্দুল আহাদ। আলী আমজদ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক শাহাব উদ্দিন, ইংরেজি শিক্ষক মাঞ্জু মিয়া সরকার ও বশির উদ্দিন। হাফিজা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক মাহবুবুর রহমান স্বপ্ন, সরওয়ার আহমদ ও মিনহাজ নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।
এবিষয়ে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের ইংরেজি প্রভাষক মোঃ আবু হানিফ কোচিং পড়ানোর কথা স্বীকার করে বলেন, কলেজের কোনো ক্লাস আমার বাদ পড়েনা। ক্লাস শেষে এবং সকালে কয়েকটি ব্যাচ পড়াই।
ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক মোঃ জিয়াউর রহমান তিনিও কোচিং পড়ানোর কথা স্বীকার করে বলেন, অভিবাবকরা আমার কাছে ছেলেমেয়ে দিয়ে শান্তিতে থাকে। অন্যান্য শিক্ষকরা যে ভাবে কসাইর মতো টাকা আদায় করে আমি তা করি না। বরং অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে বিনা টাকায় পড়াই।
শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি বিশিষ্ট কলামিষ্টা মোঃ আবু তাহের বলেন, এভাবে সরকারি নীতিমালা না মেনে শিক্ষকরা যদি কোচিং চালিয়ে যান তাহলে শিক্ষা ক্ষেত্রে এ জাতি আগাতে পারবেনা। কিছু কিছু শিক্ষকরা সর্বদা টাকা উপার্জন নিয়ে ব্যস্থ থাকবেন। এজন্য আইন প্রয়োগ করে কোচিং বন্ধ করা একান্ত প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com