মৌলভীবাজারের বাইক্কা বিলে পাখি সংখ্যা বেড়েছে : পাখি কমেছে হাকালুকি হাওরে

January 30, 2019,

স্টাফ রিপোর্টার॥ হাকালুকি হাওর ও বাইক্কাবিলে পাখিশুমারি শেষ হয়েছে। পৃথক ভাবে এ দুটি স্থানে পরিযায়ী ও দেশীয় জলচর পাখি শুমারি বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক ও বৃটিশ নাগরিক পল থমপসনের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর হাকালুকি হাওরে পরিযায়ী পাখির সংখ্য কম মেললেও বেড়েছে বাইক্কাবিলে পাখির সংখ্যা। হাকালুকি ও বাইক্কাবিলে চার দিন ব্যাপী এ পাখিশুমারি ২৬ জানুয়ারি ধেকে শুরু হয়ে শেষ হয় ২৯ জানুয়ারি।

বাইক্কাবিলে দেখা মিলেছে  ৩৯ প্রজাতির ১১ হাজার ৬১৫টি পাখি:-

বাইক্কাবিল : এবছর মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাইক্কাবিলে দুইদিন ব্যাপী পাখিশুমারি অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৩৯ প্রজাতির পরিযায়ী ও দেশীয় জলচর পাখির দেখা মিলেছে। তার মধ্যে রয়েছে ১৯ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আর ২০ প্রজাতির দেশীয় জলচর পাখি। ২০১০ সালের পর ২০১৯ সালে এসে এতো বেশী পরিমানের পাখি বাইক্কাাবিলে দেখা মিলেছে।  হাইলহাওরে মাছ বিলুপ্ত হতে থাকলে ২০০৩ সালে চাপড়া, মাগুড়া ও যাদুরিয়া বিলের ১০০ একর জলাভূমিতে বাইক্কা বিল নামে একটি স্থায়ী অভয়াশ্রম ঘোষনা করা হয়। এরপর থেকে ধীরে ধীরে বিলটি মাছের পাশাপাশি পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে উঠে।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটায় পাখি গনণাকারী ও বিশেষজ্ঞ বৃটিশ নাগরিক ড.পল থম্পসন জানান, এর আগে বিগত ২০১০ সালে এ বিলে ৪০ প্রজাতির ১২ হাজার ২৫০ টি পাখির দেখা মিলেছিল। ২৮ ও ২৯ জানুয়ারী দুইদিন ব্যাপী  বাইক্কাবিলে অবস্থান করে পাখি গণনা করেন। এশিয়ান ওয়াটার বার্ড সেনসাস এর অধীনে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব বাইক্কাবিলে এই পাখি শুমারী করা হয়।

পল জানান, ২০০৪ সালে বাইক্কাবিল প্রতিষ্ঠার পর ওই বছরের জুলাই মাস থেকে পাখিশুমারির আওতায় নিয়ে আসা হয়। ওই বছরে মোট ২৯৬ টি জলচর পাখি বাইক্কাবিলে আসে। ২০১৮ সালে  এ বিলে ৩৮ প্রজাতির ৫৪১৮টি পাখির দেখা মিলেছিল। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে ৪১ প্রজাতির  ১০হাজার  ৭১৩টি  পাখির দেখা মিলেছিল। ২০১৬ সালে বাইক্কাবিল অভয়াশ্রমে পরিযায়ী ও দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মোট ৮ হাজার ৮৩২টি জলচর পাখি গণনা করা হয়। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে পাখি শুমারিতে ৬ হাজার ৯৯১টি জলচর পাখি এই শীত মওসুমে বাইক্কা বিলে শুমারীর সময় অবস্থান করে।

বাইক্কা বিলে পাখিশুমারির তথ্যে জানা যায়, ২০০৫ সালে বাইক্কবিলে মোট ১ হাজার ১৭৪টি জলচর পাখি আসে, ২০০৬ সালে আসে ৬ হাজার ৯৪৯টি, ২০০৭ সালে ৭ হাজার ২০৪টি, ২০০৮ সালে ৬ হাজার ৪২৯টি, ২০০৯ সালে ৯ হাজার ৪০৫টি, ২০১০ সালে ১২ হাজার ২৫০টি, ২০১১ সালে ৫ হাজার ৯৮৯টি, ২০১২ সালে ৩ হাজার ৯৬৪টি, ২০১৩ সালে ৭ হাজার ৪৯৯টি, ২০১৪ সালে ১০ হাজার ৪৭৯টি পরিযায়ী ও দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির জলচরপাখি বাইক্কাবিলে আসে।

বাইক্কাবিলে পাখি বছরে বছরে দেশীয় ও পরিযায়ী জলচর পাখি কম বেশীর কারণ জানতে চাইলে ডক্টর পল থম্পসন বলেন, বাইক্কাবিল অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার পর সেখানে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজকর্ম করা হয়। এর মধ্যে যেমন হিজল করচের বাগান,গাছ লাগানো,খনন কাজ করা হয়। এ কাজ গুলো সাধারণত শুকনা সিজনে করা হয়। যখন পাখি আসা শুরু হয়। তখনই কাজ শুরুর কারণে পাখি আসা কমে যায়। আবার কাজ শেষের পর পাখি আসা শুরু করে। তিনি বলেন,পরিযায়ী পাখিরা আসার পূর্বে তাদেও আবাসস্থলটি নিরাপদ কি না সেটি বিবেচনায় রাখে।

যখন পাখিরা আসে তখন জলাভুমিতে মাছ ধরা পড়ে। মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। তাই শিকারের ভয়ে অর্থাৎ পাখিরা যখন বুঝে নেয় তাদের আবাসস্থলটি নিরাপদ নয়, তখনই পরবর্তী বছরে পাখির আনাগোনা কমতে থাকে। এছাড়া পরিযায়ী পাখি যখন যেখান থেকে তারা আসে সেখানে প্রজনন অবস্থা কি রকম ছিল বা যে পথে আসা যাওয়া করে সেই পথের সার্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। এমনকি বাইক্কাবিলের বাহ্যিক অবস্থা যে পরিমাণে গভীরতা,জলজ উদ্ভিদের পরিমাণ, প্রাচুর্য্য এসবের উপর নির্ভর করে। যেমন বিভিন্ন প্রজাতির বিভিন্ন ধরনের আবাসস্থল  পছন্দ করে। তাদের খাবার ভিন্ন ভিন্ন। এসব কারণেই পাখি বছরে বছরে কম বেশী হয়।

পল থম্পসন বলেন, এ বছর বাইক্কবিলে খয়রা কাস্তেচরা নামের পরিযায়ী জলচর পাখিটি এতো বেশী এসেছে। যা আর কোনও সময় আসেনি। এখন থেকে ৪/৫ বছর আগে বাংলাদেশে দেখা মেলেনি। এটি এখন প্রতি বছর এর সংখ্যা বাড়ছে। এবছর বাইক্কাবিলে এ জাতীয় ২৮৮ টি পাখির দেখা মেলে। বাইক্কাবিলে এ পাখিটির সংখ্যা এ যাবতকালের সবচেয়ে বেশী এসেছে। সবচেয়ে বেশী এসেছে  গেওয়ালা বাটান পাখিটি। এবছর ২ হাজার ২৮০ টির দেখা মেলেছে। এপাখিটির সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে। এছাড়া বাইক্কাবিলে অন্যান্য যেসব পাখির দেখা মেলেছে সেগুলো হলো, পাতি তিলি হাঁস ২ হাজার ২২০টি, রাজ শরালী ৩৯৮টি, পাতি শরালী ৮৬০টি, উত্তুরে ল্যঞ্জা হাঁস ৯২১টি।

পল থম্পসন আরো বলেন, যেভাবে হাইল হাওরের বাইক্কাবিলের পার্শ্ববর্তী প্লাবন ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে বিভিন্ন মৎস্য খামার প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এর ফলে প্লাবন ভূমি অর্থাৎ উন্মুক্ত জলাভূমির ব্যাপ্তি সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলশ্রুতিতে মাছের বিচরণ ক্ষেত্রের ফাশাপাশি হাওর এলাকায় প্রজনন ক্ষেত্রও হারিয়ে যাচ্ছে। এমনকি দেশীয় প্রজাতির মাছকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। জীব বৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। স্থানীয় দারিদ্র জনসাধারণ তাদের জীবন জীবিকার জন্য বিভিন্ন ধরণের সম্পদ আহরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে কিছু সংখ্যক বিত্তশালী লোক তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়ে সম্পদের পরিমাণ বাড়িয়ে তুলছে।

পল থম্পসন বলেন, যদি সরকার এবং স্থানীয় জনসাধারণ একসাথে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করেন, তাহলেই কেবল প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ করা সম্ভব। যার ফলশ্রুতিতে হাওরের  সুন্দর পরিবেশ, বন প্রাণীর সংখ্যা, মাছ, সর্বোপরী জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। এবং স্থানীয় জনসাধারণের উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি চিত্ত বিনোদনের পথকে আরো সুগম করবে।

পাখিগুলো আসে কোথা থেকে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সুদূর সাইবেরিয়া, চায়না, মধ্য এশিয়া,  ইন্ডিয়া ও আসাম থেকে। আর কিছু হলো স্থানীয় দেশীয় প্রজাতীর পাখি বাইক্কা বিলে আসে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে পল থম্পসন বলেন, গত মওসুমে বাইক্কাবিলে অনেক শাপলা,শালুক,পদ্ম ফুল ফুঁটে। সেকারণে পাখির সংখ্যা বেড়েছে। এই বছর বাইক্কাবিলে পানির নির্দিষ্ট পরিমাণে থাকার ফলে পাখিরা অবাধে বিচরণ করতে পারে। বিলে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ, মাছ, পোকামাকরের একেই সঙ্গে অবস্থানে থাকায় এ বছর পাখির পরিমাণ বেড়েছে।

২০১৭ সালে হাওরে পানির পরিমাণ  বেড়ে যাওয়ায় ২০১৮ সালে শুকনো মৌসুমে পদ্ম শাপলা শালুক ভাল ভাবে বেশী জনামাতে পারেনি। সেকারণে ২০১৮ সালে পাখির পরিমাণ এতো কম ছিল। তবে বাইক্কা বিলের আশপাশে বসত বাড়ী ও ব্যক্তি পর্যায়ে ফিসারী যদি আরও বেড়ে যায় তাহলে পাখির সংখ্যা আগামীতে কমে যাবে বলে আশংকা প্রকাশ করেন তিনি।

হাকালুকি হাওরে এ বছর ২০ হাজার ৩৫০টি পাখি কমেছে :-

হাকালুকি : দক্ষিন এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকিতে পরিযায়ী পাখির সমাগমস্থলে অনুষ্ঠিত পাখি শুমারিতে ২০ হাজার ৩৫০টি পাখি কমেছে। মৌলভীবাজারের ৩টি উপজেলা কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা এবং সিলেটের ৩টি উপজেলা বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জের ১৮হাজার একশত ১৫ হেক্টর পরিমাণ জমি নিয়ে এ হাওরের অবস্থান।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার’র (আইইউসিএন) জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। হাকালুকি হাওরে ২৩৮টি বিলের মধ্যে ৪০টি বিলে পাখি শুমারি শেষে ২৮ জানুয়ারি বিকেলে আইইউসিএন বাংলাদেশ তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে সর্বমোট ৫১ প্রজাতির ৩৭ হাজার ৯৩১টি জলচর পাখি পাওয়া গেছে।

২৬-২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত শুমারিতে অংশ নিয়েছেন ড. পল থমসন, ইনাম আল হক, মোহাম্মদ ফয়সাল, ওমর শাহাদাত, সাকিব আহমেদ, বশীর আহমেদ ও তারেক অণু।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের তথ্য অনুসারে ২০১৭ সালে হাকালুকি হাওরে পাখির সংখ্যা ছিল ৫৮ হাজার ২৮১টি। ২০১৮ সালে তা কমে এসে দাঁড়ায় ৪৫ হাজার ১শ’টি। ২০১৯ সালে সে সংখ্যা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৯৩১টিতে। শুমারি চলাকালে হাকালুকি হাওরের পরোতি, বালিজুড়ি, নাগুয়াধলিয়া বিলে বিষটোপ দিয়ে মারা পাখি পাওয়া গেছে।

জরিপে হুমকির মুখে আছে এমন ছয় প্রজাতির পাখিও পাওয়া গেছে বলেও জানানো হয়। তার মধ্যে মহাবিপন্ন- বেয়ারের ভুঁতিহাঁস, সংকটাপন্ন- পাতি ভুঁতিহাঁস ও বড়-গুটিঈগল এবং প্রায়-সংকটাপন্ন- মরচেরঙ ভুঁতিহাঁস, ফুলুরি-হাঁস ও কালামাথা-কাস্তেচরা।

পাখিসমৃদ্ধ বিলের মধ্যে নাগুয়াধলিয়া বিল প্রথম (৮ হাজার ৬৭৬টি পাখি) এবং চাতলা বিল দ্বিতীয় (৫ হাজার ৩২৭টি পাখি)। জলচর পাখিদের মধ্যে মাত্র ৪০৫টি সৈকতপাখি পাওয়া যায়।

হাকালুকি হাওরের যে ৪০টি বিলে এ শুমারি পরিচালনা করা হয় তা হলো- কালাপানি, রঞ্চি, দুধাই, গড়কুড়ি, চোকিয়া, উজান তরুল, হিংগাউজুড়ি, নাগাঁও, লরিবাঈ, তল্লারবিল, কাংলি, কুড়ি, চেনাউড়া, পিংলা, পরোটি, আগদের বিল, চেতলা, নামাতরুল, নাগাঁও ধুলিয়া, মাইছলা ডাক, মালাম, ফুয়ালা, পলোভাঙা, হাওড় খাল, কইরকণা, মোয়াইজুড়ি, জল্লা, কুকুরডুবি, বালিজুড়ি, বালিকুড়ি, মাইছলা, গড়শিকোণা, চোলা, কাটুয়া, তেকোণা, মেদা, বায়া, গজুয়া, হারামডিঙা, গোয়ালজুড়।

হাকালুকি হাওরটি কোন উন্নয়ন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় অরক্ষিত হাওরে বিষটোপ আর ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করায় দিন দিন অতিথি পাখির সমাগম কমছে। মৎস্য অভয়াশ্রম থাকলেও সেই অভয়াশ্রমগুলোতে শিকারিরা হানা দেয়। হাওরের ইকো সিস্টেম রক্ষায় অবিলম্বে হাকালুকিকে হাওর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি হাওর পাড়ের মানুষের।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com