প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও শেষ হয়নি ২ ভাগ কাজও উদ্বেগ উৎকন্ঠায় মনু নদীর তীরবর্তী বাসিন্দারা

ইমাদ উদ দীন॥ মনু নদীর মাঝ খানে এখন হাটু পানি। কোথাও একটু পানি হলেও অধিকাংশই ধূ ধূ বালুচর। নদী জুড়ে জেগে উঠা চরই এখন খেলার মাঠ। পানিহীনতায় ব্যাহত হচ্ছে ক্ষেতকৃষি।এমন দৃশ্যে ঐতিহ্য হারানো আক্ষেপ থাকলে ভয় জাগছে আগত বর্ষা মৌসুম নিয়ে। কারন ২০১৮ সালের রাক্ষুসী বন্যার করাল গ্রাস আর ক্ষয়ক্ষতির তান্ডব এখনো তাদের স্মৃতিপটে। আয়তন আর নাব্যহ্রাসে নদীর পানি ধারন ক্ষমতা একেবারেই কমে যাওয়ায় গেল বছরের মত আর্কষিক বন্যার ভয় স্থানীয়দের। নদী পাড়ের কয়েক লাখ বাসিন্দা এখন থেকেই এমন দূশ্চিন্তায়। কারন গেল বছরের ভয়াবহ বন্যায় ঘরবাড়ি আর ক্ষেতকৃষি হারানোর ক্ষয়ক্ষতি এখনো পুষিয়ে উঠতে পারেননি তারা। ওই ভয়াবহ বন্যার পর সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের নানা প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাসে আশান্বিত ছিলেন দূর্ভোগগ্রস্থরা। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে তাদের সে স্বপ্ন প্রত্যাশা ফিকে হচ্ছে। শুধু ভাঙ্গাস্থানে জোড়াতালি দিয়ে গতানুগতিক নিয়মেই বাঁধ মেরামত করা হয়েছে। আবারো বাঁধ ভাঙ্গন ও বন্যার ভয়ে নদী পাড়ের ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ এখন ক্ষেত কৃষি আর ঘরবাড়ি নিয়ে মহাদুশ্চিন্তায়। উজান থেকে আসা পলিতে নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় পানির ধারন ক্ষমতায় এখন নেই বললেই চলে। তাই নাব্যহ্রাস হওয়া নদী খনন,স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতসহ সর্বপরি নদী শাসনের দাবি দীর্ঘদিন থেকে নদী পাড়ের ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের। এই দাবিতে তারা শৃঙ্খলিত নানা আন্দোলনও করেছেন ও করছেন। তারপরও কিছুতেই ঠনক নড়ছেনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। মনু নদীর এমন বেহাল অবস্থা ও খনন কাজের অনিয়ম নিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজার জেলা শাখার উদ্যোগে মৌলভীবাজার পৌরসভার হল রুমে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। ওই সভায় মনু নদীর দূর্দশা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের নানা উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার বিষয়টি উঠে আসে। মনু নদী খনন ও বর্তমান বাস্তবতা শীর্ষক ওই মতবিনিময় সভার আলোচনায় মৌলভীবাজারের মনু নদীর (মনু ব্যারেজ থেকে মনু মুখ পর্যন্ত) ২৩ কিলোমিটার নাব্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়াধীন বিআইডব্লি¬উটিএর ২৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহন করার বিষয়টি গুরুত্বপায়। মতবিনিময় সভায় বলা হয় ওই প্রকল্পের কাজের মেয়াদ শেষ হলেও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নানা অজুহাতে শতকরা ২ ভাগ কাজও এখনো শেষ করেনি। তাদের অভিযোগ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নানা ছুঁতায় প্রকল্পের পুরো টাকাই আত্মসাতের পায়তারা করছে। তাদের কাজের ধরন দেখে এমনটিই প্রতিমান হচ্ছে বলে সভায় সকলেই তাদের মতামত ব্যক্ত করেন। সভায় উপস্থিত পৌর মেয়র, সুশীল সামাজের প্রতিনিধি ও শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ কঠোর হুঁিশয়ারী দিয়ে বলেন আমাদের জীবন মরণ সমস্যা মনু নদী খনন,বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত নিয়ে কোন ধরনের টালবাহানা বরদাস্ত করা হবেনা। সভায় সিন্ধান্ত হয় বাপার সমন্বয়ে সকলের সম্মেলিত প্রচেষ্ঠায় তারা মনু নদী খনন কাজের অনিয়মসহ ভরাট হয়ে যাওয়া জেলার মৃত্যু পথযাত্রী নদী,হাওর, খাল,গাঙ্গ ও ছড়া খনন ও তার বাঁধ মেরামতের দাবিতে ২০ ফেব্রুয়ারী মনু নদীর পাড়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে মানবন্ধনের। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজার জেলা শাখার সমন্বয়ক আ.স.ম ছালেহ সুহেল বলেন মতবিনিময় সভায় গৃহিত সিন্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মানবন্ধনের প্রস্তুতি চলছে। ২০ ফেব্রুয়ারী সকালে মনু নদীর পাড়ে ওই মানবন্ধন সকলের সার্বিক সহযোগিতায় অবশ্যই সম্পন্ন হবে।
মেয়াদ শেষ কিন্তু ২ ভাগ কাজও শেষ হয়নি
মনু নদী খননের কাজের নির্ধারিত সময় শেষ। কিন্তু এখনো ২ ভাগ কাজও শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। জানা যায় মনু নদী রক্ষা ও সারা বছর নৌযান চলাচলের উপযোগী পানির গভীরতা নিশ্চিত করতে খননের উদ্যোগী হয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লি¬উটি)। বিআইডবি¬উটিএ অভ্যন্তরীণ ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের আওতায় মনু নদীও স্থান পায়। মৌলভীবাজারের মনু নদীর ২৩ কিলোমিটার নাব্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রাক্কলিত ব্যয় ২৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহন করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়াধীন বিআইডব্লিউটি। ওই প্রকল্পে ২০ লাখ ঘনমিটার নদীর ভরাট মাটি ড্রেজার ও একসেভেটর দিয়ে খনন ছাড়াও খননের প্রস্থ ২৫ মিটার ও গভীরতা ৮ ফুট করা কথা রয়েছে। এই কাজের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের দ্বায়িত্ব পায় বঙ্গ ড্রেজার লিমিটেড। জানা যায় ২০১৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারীতে কাজ শুরু হয়ে ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারীতে কাজটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নানা অজুহাতে এখনো ২ ভাগ কাজও শেষ করতে পারেনি। বিআইডব্লিউটি সুত্রে জানা যায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নানা অজুহাতের প্রেক্ষিতে কাজের মেয়াদ আরো ২ মাস বৃদ্ধি করা হয়েছে। এবিষয়ে মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র ফজলুর রহমান বলেন বিআইডব্লিউটি এর এই প্রকল্পের খনন কাজ নিয়ে সম্প্রতি এই বিষয়ে জেলায় একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের লোকজন উপস্থিত ছিলেন। সভায় মনু নদী খনন কাজের ধীরগতি ও গাফলতি নিয়ে সকলেই অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন সভায় ওই প্রকল্পের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খনন কাজ সম্পন্ন করতে বিআইডব্লিউটি ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বঙ্গ ড্রেজার লিমিটেডকে অনুরোধ করা হয়। অন্যতায় এই গাফলতি কারনে সকল ক্ষয়ক্ষতির দ্বায়ভার তাদের উপর বর্তাবে বলেও সর্তক করা হয়। জেলা প্রসাশন সুত্রে জানা যায় রোববার জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটিতেও এই জনগুরুত্বপূর্ন বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পায়। জেলা প্রসাশকের সভাপতিত্বে ওই সভায় জেলার সকল দপ্তরের লোকজনই এই খনন কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে তাগিদ দেন। জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিব,মৌলভীবাজার জেলা বন্যা প্রতিরক্ষায় প্রেশার গ্রুপের সভাপতি সাংবাদিক বকশী ইকবাল আহমদ,সম্মিলিত সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ মৌলভীবাজার এর সভাপতি নাট্যকার খালেদ চৌধুরী বলেন মনু নদী এ জেলার অধিকাংশ মানুষের যেমন জীবন জীবীকার উৎস। তেমনি নদী পাড়ের মানুষের জীবন মরণ সমস্যাও। কিন্তু আয়তন কমে যাওয়া ও ভরাট হওয়া নদীটি এখন বেহাল দশায়। তারা বলেন মনু নদী খনন কাজ হবে জেনে আনন্দিত হয়েছিলাম। কিন্তু এখন বিআইডব্লিউটি ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বঙ্গ ড্রেজার লিমিটেড এর গাফলতিতে আমরা আশাহত হচ্ছি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে আসলেও কাজের অগ্রগতি নেই। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে খনন কাজ না করেই টাকা হাতিয়ে নেয়ারই উদ্দেশ্য তাদের। তাই মেয়াদ শেষ পর্যায়ে হলেও এখনো দৃশ্যমান কোন কাজও করতে পারেনি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নানা অজুহাতে হয়ত অপেক্ষা করছে বর্ষা মৌসুমের। কারন তখন পানি চলে আসলে প্রমাণ করা যাবে না যে কাজ হয়েছে নাকি হয়নি। তারা কঠোর হুঁশিয়ারী দিয়ে বলেন তাদের এমন অর্থলোভী মানুষিকথা আর গাফলতির কারনে আমাদের কোন করুন পরিস্থিতি বরদাস্ত করা হবেনা।



মন্তব্য করুন