ভোটের ডাকে সাড়া নেই ভোটারের প্রার্থীদের দৌড়যাঁপ ঘুমন্ত ভোটার

ইমাদ উদ দীন॥ বলতে গেলে ভোটের পিঠে ভোট। জাতীয় নির্বাচনের পর এখন উপজেলা নির্বাচন। গেল নির্বাচনের পর ভোটকে আর উৎসব বা আমেজ বলে মনে হয়না। কারণ গেল জাতীয় নির্বাচনের স্মৃতি সুখকর নয় ভোটারদের। এখন ভোট মানেই বাড়তি উদ্বেগ উৎকন্ঠা। হামলা মামলা আর ঘর বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়ানো। তাই ভোট এলেই কি আর গেলেই কি। ওই সব ঝক্কি ঝামেলাতে জড়ানো আমাদের মত খেটে খাওয়া মানুষের কাজ না। ভোটের তিক্ত অভিজ্ঞতায় ক্ষোভ আর হতাশা নিয়ে একথাগুলো জানালেন মৌলভীবাজার শহরের ব্যবসায়ী ইশতেয়াক আহমদ হাবিব,রিকশা চালক করিম মিয়া,অটোচালক চালক সমির মিয়া, মনফর আলী,শহরতলী মোস্তফাপুর বিন্নার হাওর এলাকার কৃষক আসুক মিয়া, শফিক মিয়া,নগেন্দ্র দাস,শুক্কুর মিয়া, কবির মিয়া,মন্তই মিয়া প্রমুখ। তাদের মত একই কথা জেলার ৭টি উপজেলার অধিকাংশ ভোটারদের। ভোট দিতে কেন্দ্রে যাবেন কিনা। নিজ উপজেলার কোন প্রার্থীকে ভোট দিবেন। নির্বাচনে কাকে যোগ্য প্রার্থী মনে করেন কিংবা কোন প্রতীক তাদের পচন্দ। এমন নানা প্রশ্নে অধিকাংশ ভোটারের উত্তর একটি। আমরা আর ভোট কেন্দ্রে যেতে চাইনা। আমরা ভোট কেন্দ্রে গেলেই কি। আর না গেলেই বা কি। ভোটের দিন ভোট কেন্দ্র গুলোতে ভোটারদের সারি জনশূন্য থাকলেও ভোটের বাক্রতো ঠিকই ভরে যায়।
লক্ষাধীক ভোটের ব্যবধানে প্রার্থীও বিজয়ী হন। তা হলে ওখানে গিয়ে ফ্যাসাদে জড়ানোর কি দরকার। গেল নির্বাচনের গায়েবী মামলায় অনেকেই এখন জেল হাজতে আছেন কিংবা জামিনে আছেন। আদালত আর বাড়ি এ ধর্ণায়ই এখন সময় পার। ওই দু:ষহ অভিজ্ঞতা আর ভয়ভীতি থেকে নির্বাচনী আলাপই করতে রাজী হচ্ছেন না তারা। ভোটারদের সাথে আলাপে জানাগেল আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তাদের কোন বাড়তি আগ্রহ বা কৌতুহল নেই। বরং নির্বাচনের দিনক্ষন পেরোলেই যেন তারা হাফ ছেড়ে বাঁচেন। এখন জেলার ৭টি উপজেলা জুড়ে হরদম চলছে মাইকিং,পোস্টারিং। গণসংযোগ আর উঠান বৈঠক। প্রার্থীদের পক্ষ থেকে বাদ পড়েনি ভোটের কোন আয়োজনই। প্রচার প্রচারণা রাত দিন একাকার। সবমিলিয়ে এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন দ্বিতীয় ধাপের ৫ম উপজেলা নির্বাচনের প্রার্থী ও তাদের অনুসারীরা। ভোটারদের মন জয় করতে বাদ যাচ্ছেনা কোন কৌশলই। কিন্তু তারপরও কাজ হচ্ছেনা। কিছুতে ভোটের আমেজ ছড়াচ্ছেনা। আর ভোট নিয়েও খেয়ালী বা মোটেই আগ্রহী হচ্ছেন না ভোটার। প্রার্থীরা সরব হলেও ঘুমন্ত ভোটার। এর কারন হিসেবে জানা গেল জাতীয় নির্বাচনের প্রভাবে ভোটারদের এমন বিরুপ প্রতিক্রিয়া। তারা ভোট থেকে অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তাই এপর্যন্ত জনসমাগমের স্থান গুলোতেও দৃশ্যমান হচ্ছেনা ভোটের সরব আলোচনা। বরং প্রার্থীদের একযোগে একই এলাকায় জোর প্রচার প্রচারণায় বাদ্যযন্ত্র আর গায়েনসহ মাইকিংয়ে শব্দ দূষণের ভীড়ম্বনায় ভোটার। এজেলার ৭টি উপজেলায় ১৮ মার্চ ভোটের দিনক্ষন নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় ভোটের মাঠে প্রার্থীরা সরব হলেও উল্টো দৃশ্য ভোটারদের। ভোট নিয়ে বাড়তি উৎসাহ উদ্দীপনা কিংবা কৌতুহল এজেলার ভোটারদের মধ্যে তা পরিলক্ষিত হচ্ছে খুবই কম। ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যাবেন কিনা। ভোট স্বচ্ছ হবে কিনা। এমন উৎকন্ঠা থেকে ভোটারদের উজ্জীবিত করতে বাড়ি বাড়ি কর্মী সমর্থক পাটিয়েও তেমন সুফল মিলছেনা এখনো। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা ভোট দিতে কেন্দ্রে যাবেন। অবাদ সুষ্ট ও নিরপেক্ষ ভোট হবে এমনটিই প্রত্যাশা প্রার্থীদের। একাধীক প্রার্থীর সাথে কথা বলে জানা গেল বিগত বছরগুলোর উপজেলা নির্বাচনে যে রকম উৎসাহ উদ্দীপনা আর আমেজ ছিল তার কোনটাই এবারকার নির্বাচনে তাদের পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। আর নিরাপদ ভোট দেয়া নিয়ে যতসব সরব জল্পনা-কল্পনা ভোটারদের। তাই মুখ খুলে জোরে সুরে আলোচনা নেই ভোটের। ভোটের দিন ভোট কেন্দ্রগুলোতে দাঙ্গা ফ্যাসাদ খুন খারাবি কিংবা কেন্দ্র দখলের মতো বিশৃঙ্খলা হবে কি না। প্রশাসনের ভূমিকা কেমন হবে এমন নানা প্রশ্ন ঘুর পাক খায় ভোটারদের। এমন সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর না পাওয়ায় ভোট নিয়ে উৎসবের চাইতে তা ভয় ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলার ৭টি উপজেলা ঘুরে দেখা গেল শহর এলাকায় ভোটের হাওয়া কিছুটা সরগরম থাকলেও উল্টোদৃশ্য গ্রাম এলাকায়। মৌলভীবাজার জেলার ৭টি উপজেলায় ৫টি পৌরসভা ও ৬৭টি ইউনিয়ন। ভোটার সংখ্যা ১৩,০৪০,৬৩ জন। মৌলভীবাজার ৭টি উপজেলায় চেয়ারম্যান প্রার্থী ২৩ জন। ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ) ৩৫ ও ভাইস চেয়ারম্যান (মহিলা) ৩০ জন প্রার্থী সহ ৮৮ জন প্রার্থী। চেয়ারম্যান পদে মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় আওয়ামীলীগ মনোনীত মো: কামাল হোসেন বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় বিজয়ী হয়েছেন।
জেলার ৭ উপজেলার মধ্যে মৌলভীবাজার সদর উপজেলা, জুড়ী ও বড়লেখার রির্টানিং অফিসারের দ্বায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ আশরাফুর রহমান। অপর দিকে শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ ও কুলাউড়ার রির্টানিং অফিসারের দ্বায়িত্বে রয়েছেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোঃ মঞ্জুরুল হক। তবে ভোটারদের এমন নীরবতায় এজেলার রাজনীতিবীদ,সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সচেতন ভোটাররা মনে করছেন এমন মনোভাব গণতন্ত্র ও রাজনীতির জন্য অসনী সংকেত। তাদের প্রত্যাশা প্রবাসী,পর্যটন ,চা, আগর, রাবার বাগান আর হাকালুকি হাওরের জন্য বিখ্যাত এ জেলাটির সচেতন বাসিন্দারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে ভোট কেন্দ্রে যাবেন। এবং অন্যকেও উৎসাহীত করবেন।
এবিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর মৌলভীবাজার জেলা সভাপতি ডা: ছাদিক আহমদ বলেন এটা ঠিক একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মত এ নির্বাচন এত উৎফুল্ল বা উৎসব মুখর নয়। অবস্থা দৃষ্টে এমনটিই মনে হচ্ছে। তবে প্রার্থীরা ভোটারদের ভোটদানে উৎসাহী করতে হবে। জনগণের মত সুজনও অবাদ সুষ্ট নিরপেক্ষ ও স্বচ্চ ভোটের পক্ষে। ভোটররা তাদের ভোটদানে ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিবেন এমনটিই প্রত্যাশা আমাদের।



মন্তব্য করুন