আস্থার এক টুকরো জায়গা নেই যে যেখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে সালমান শাহ্ হত্যার ন্যায় বিচার চাইব চাই প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ

আল আমিন আহমেদ॥ সালমান শাহ্ হত্যা মামলার শেষ কোথায়? দেশের লাখো ভক্তদের এ প্রশ্ন অনেকের কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। মানুষের মনে প্রশ্নটা জাগার অন্যতম কারণ হচ্ছে আলোচিত এ হত্যাকান্ডের বিচারকাজ চলছে এতটাই কচ্ছপ গতিতে যে ভক্তরা বিচার পাওয়া না পাওয়া নিয়েই এখন দোলাচালে রয়েছেন। সালমান শাহ্ কোন বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন এ কথা সত্য ধরে নিলেও দেশে-বিদেশে সালমান শাহ’র লাখো ভক্ত অনুরাগী রয়েছে এ সত্য যাচায়ের জন্য কোন জরীপের প্রয়োজন আছে বলে কেউ মনে করেন না। বিষয়টা বিপ্লবী চেতনা নয়, প্রকৃত সত্য হলো সাধারণ মানুষেরা যারা সালমান শাহ্কে মনের সুপ্ত অন্ত:পুরীতে ঠাঁয় দিয়ে রেখেছে, সেই শ্রেণীর মানুষ এ মৃত্যুকে আত্মহত্যার তকমায় বিশ্বাস রাখতে অপারগ। ফলে সালমান শাহ্’র মা নীলা চৌধুরীর মতো অনেকের বিশ্বাস সালমান শাহ্কে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে। আর বিচারে ধীর গতি বিচারহীনতার আশংকার জায়গাটা তৈরী করে রেখেছে।
সরকার দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য সংগ্রাম করছে। এ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে কঠিন পথও অতিক্রম করছে। একাত্তরের স্বাধীনতা বিরোধীদের শূলে চড়ানো হয়েছে। জাতীর পিতার হত্যাকান্ডের বিচার রধ করতে ইন্ডিমেনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। সব বাঁধা পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর বিচার হয়েছে। খুনীদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুঁলানো হয়েছে।
কিন্তু ২৩ বছরে সালমান শাহ হত্যা মামলা তদন্ত প্রতিবেদন দেই দিচ্ছি পর্যায়ে রয়ে গেছে। তাহলে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বন্ধ কপাট কি আদতেই খুলেনি? সরকার গোলাম আযম, নিজামীর মতো রথী মহারথীদের বিচার কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হলেও স্বাধীন বাংলাদেশে একজন সাধারণ মানুষের মতো সালমান শাহ্ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার দাবীতে কেন আমাদের ২৩ বছর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। তবে কি অভিযুক্তরা খুবই শক্তিশালী? রাষ্ট্র ’র চেয়েও?। মানুষ তা মনে করে না। সালমান ভক্তরা মনে করেন, সালমান শাহ্র হত্যা বিচার এখন রাষ্ট্রের অনূকূল্যের উপর নির্ভর করছে। এখন দেশে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি হস্তক্ষেপ না করলে কারো বিচার কাজ শুরু হয় না। সর্বশেষ নুসরাত জাহান যখন আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলেন তখন ক্ষমতার ছত্র ছায়ায় দাঁড়িয়ে দুর্বৃত্বরা ঘোষনা করেছিল নুসরাত গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহুতি দিয়েছে। নুসরাতের পরিবারের আহাজারি বাতাসে মিলিয়ে গেলেও কর্ণপাত কেউ-ই করেনি। না পুলিশ-প্রশাসন না ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা সমাজপতিরা। তারপরের খবর হলো খোদ প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। এক মাসের ব্যবধানে পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন থেকে শুরু করে অভিযোগপত্র পর্যন্ত দাখিল করেছে- এমন খবর সংবাদ মাধ্যমে বের হয়েছে। তাহলে সালমান শাহ্র হত্যা মামলার বেলায় ২৩ বছর কেন? পিবিআই এর ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার এই দুই মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা। এক প্রতিষ্ঠান একই তদন্তকারী, তাহলে যাত্রার ফলাফল দুই রকেমের কেন? এ প্রশ্নের জবাব কে দেবেন? যে কারণে এই বিচার সম্পন্ন করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে-এমনটা মনে করেন ভক্তরা।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টম্বর সালমান শাহ’র মৃত্যু হয়। প্রথমে আত্মহত্যা বলে চালানো হলেও পরবর্তিতে এটিকে হত্যা মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এখন ২০১৯। মাঝের এই ২৩ টি বছর আমরা লক্ষ্য করেছি কিভাবে একের পর এক তদন্ত সংস্থা, তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে। কিভাবে রাষ্ট্র রিট আবেদন করে তদন্ত স্থগিত করেছে। কিভাবে বছরের পর বছর শুধু তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় চাওয়ার সিরিজ নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে। আমরা এখন ক্লান্ত, অবিশ্রান্ত, অসহায় এবং আশাহীন। সত্যি বলতে কি, আস্থার এক টুকরো জায়গাও এখন অবশিষ্ট নেই। যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে প্রিয় নায়ক সালমান শাহ্ হত্যার ন্যায় বিচার চাইব।
আমি সালমান শাহর হত্যা বিচার তরান্বিত করতে যখন সামাজিক আন্দোলন শুর করলাম। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্লাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছি-একা। বিভিন্ন জেলা সফর করে সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকদের, সমাজের দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করেছি। নি¤œ থেকে উচ্চ আদালতের বারান্দায় দিনরাত দৌঁড় ঝাপ করেছি। ফেসবুক পেজে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়েছি। আমার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আহমেদ পলক, সাবেক মন্ত্রী তারানা হালিম, আইসিটি গভর্নর শমী কায়সার, সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের চেয়ারমান মোহাম্মদ এ. আরাফাত, ইত্যাদি খ্যাত হানিফ সংকেত, শামিম ওসমান এমপি, ব্যরিষ্টার সায়েদ সাইদুল হক সুমন, সংগীত শিল্পী এসআই টুটুল, নাট্যকার রহমান মতি, সাংবাদিক হিরণ খাঁনদের মতো মানুষদের সহায়তা চেয়েছি। অনেকে প্রতি উত্তর দিয়েছেন ধৈর্য ধরার, কেউ পরামর্শ, কেউ আশার কথা, কেউ কেউ হতাশার কথা শুনিয়েছেন। আমার এই প্রচেষ্টার কোন আন্তবিনিময় নেই। স্বার্থ নেই। বিবেকের তাড়নায় একজন মানুষকে ভালবাসার জায়গা থেকে এসব করেছি। আরো অনেকেই হয়তো করছেন, যে যার জায়গা থেকে। একটাই দাবী এই হত্যা মামলার সুষ্টু তদন্ত হোক, বিচার হোক। আমার সামাজিক এ আন্দোলনের একজন সুহৃদ বলেছেন, অপরাধীরা দেশের বাহিরে অবস্থান করায় তদন্ত কাজ ব্যঘাত ঘটছে। আমি তাকে সবিনয়ের সাথে বলেছি, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ভেতরে বাহিরে আমরা কেউ নই। যেখানে আত্মস্বীকৃত খুনিরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুনের বর্ণনা প্রচার করেছে।
তদন্ত কর্মকর্তার সদিচ্ছা থাকলে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বছরের পর বছর সময় প্রার্থণা করার মঞ্চ নাটকের প্রয়োজন পড়ে না। এখানে সদিচ্ছা নেই রাষ্ট্রেরও। যে কারণে ভরসার এখন একটাই জায়গা তা হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ। নষ্ট করার মতো সময় আর নেই।
২৩ জুন আবারো তদন্ত প্রতিবেদনের ধার্য তারিখ। কয়েক বছর যাবত যে ভাবে সময় প্রার্থনা করা হয়েছে ২৩ তারিখেও হয়তো আবার সময় প্রার্থণা করা হবে এই রুটিন ওয়ার্ক থেকে আমরা কবে বেড়িয়ে আসতে পারবো। প্রলম্বিত বিচার কি করে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবে? এর জবাব কার কাছে চাইবো?
২৩ বছর পেড়িয়ে ২ যুগে পা দেবে- তদন্ত কাজটাই শেষ হল না। এই পরিক্রমা আমাদের গৌরবান্বিত করে না, এটা আমরা যত তাড়াতাড়ি বুঝে উঠতে পারবো ততই ভাল।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসার পথে সালমান শাহ হত্যা মামলার দীর্ঘ তদন্ত যেন বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায় রাষ্ট্রের কাছে এটা আমাদের প্রত্যাশা।
-লেখক দীর্ঘদিন যাবত প্রয়াত সালমান শাহ্ হত্যার বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে আসছেন।



মন্তব্য করুন