সরজমিনে ধলাই নদী ওদের দু:খ ‘বিজলী বন্যা’

ইমাদ উদ দীন॥ ফ্লাশ ফ্লাড বা বিজলী বন্যা। ধলাই নদী তীরের বাসিন্দাদের আতঙ্ক। প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমেই এই আতঙ্কে তাদের রাত দিন একাকার। ওখানে কিংবা উজানে বৃষ্টিই হলে কাটে নির্ঘূম রাত। দিনের শুরুতে বাঁধ ভেঙ্গে ভয়াবহ বন্যা। দিন শেষে শান্ত নদী ঠিক আগের মতই। মধ্যখানের ভর্য়াত রুপ। চোখের পলকেই সবই শেষ। আকর্ষিক নদীর পানি উপছে উঠে ঘরবাড়ি,ক্ষেতকৃষি,মৎস্যখামার,শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান,হাটবাজার ডুবিয়ে দেয়। হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে রাক্ষুসি স্বভাবের আগ্রাসনে কেড়ে নেয় সবই। নি:স্ব হয় নদী তীরের বাসিন্দারা। গেল এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ধলাই নদী এমনি করে তার ভয়ার্ত হিং¯্র রুপ দেখাচ্ছে। আর ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন নদী তীরের লক্ষাধিক মানুষ। কিন্তু নদী শাসনের ওই অবস্থা থেকে উত্তরণের নেই কোন স্থায়ী সমাধান বা প্রতিকার। ধলাই নদীর তীরবর্তী ক্ষতিগ্রস্থ বাসিন্দারা জানান স্থানীয় অন্যান্য নদী থেকে ধলাই নদীর বৈশিষ্ট্য স্বতন্ত্র। প্রতিবছরই নদী তীরের কোথাও না কোথাও তার এই অগ্নি মূর্তি দেখাবেই। কারন দীর্ঘদিন থেকে নদীর নাব্যহ্রাস। আর ভরাট হওয়া নদীর দু’পারের বাঁধও জরাঝীর্ণ। দূর্ভোগগ্রস্থদের অভিযোগ চরম ঝুকিঁপূর্ণ দু’একটি স্থানে মেরামত হলেও হয়না অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের মেরামত। বয়ে চলা এই দূর্ভোগ স্থায়ী সমাধানে নদীর শাসনের কোনো পরিকল্পনার বাস্তবায়ন বা উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের। নদী তীরের বাসিন্দারা ধলাই নদীর এমন বন্যার নাম দিয়েছেন ‘ঝলক বা বিজলী বন্যা’। কারন আকর্ষিক ও ক্ষনস্থায়ী বন্যা ভয়ার্ত রুপ দেখায় মাত্র হাতে গুনা কয়েক ঘন্টা। এই কয়েক ঘন্টার তান্ডবেই সবই উজাড় করে গ্রাস করে রাক্ষুসে নদী। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অফিসের তথ্য মতে জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সবজি চাষ হয় কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর তীরবর্তী এলাকায়। পুরো উপজেলায় ব্যাপক সবজি চাষ হলেও সবচেয়ে বেশি হয় ধলাই নদীর তীরে। কিন্তু সবজি চাষের ঐতিহ্যবাহী উপজেলাটি শুধু মাত্র ধলাই নদী ভরাট ও বাঁধ মেরামত না হওয়ায় তাদের সেই সুনাম ও ঐতিহ্য এখন হারাতে বসেছে।
১৩ জুলাই শনিবার সকালে ধলাই নদীর রামপাশা এলাকায় গেলে ঝলক বা বিজলী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ নদী তীরের বাসিন্দারা তাদের নানা ক্ষোভ ও দু:খের কথা জানান।
শুক্রবার মধ্যরাতে হঠাৎ বন্যায় কমলগঞ্জ পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের রামপাশা এলাকায় বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত হয় নারায়ণপুর,রামপুর,কুমড়াকাপন, চৈতন্যগঞ্জ,বালিগাঁও আংশিক, কান্দিগাঁও,বনগাঁও,গন্ডামারা গ্রাম। এতে ওই এলাকার ঘরবাড়ি, ক্ষেতকৃষি,মৎস্য খামার,আমন ধানের বীজ তলা প্লাবিত হয়। ভাঙ্গন দেওয়া বাঁধের পাশে নকুল মালাকার, নিখিল মালাকার,জগিন্দ্র মালাকারসহ পাঁচ পরিবারের বসত ঘর ভেঙ্গে পানিতে তলিয়ে যায়। রামপাশার নিপু নাথ বলেন রাতেই দুবাই থেকে দেশে ফিরেছি। বাড়িতে এসেই বন্যার কবলে পড়ি। রাতে বাড়ি আর সড়কে কোমর পানি থাকলে এখন কমেছে। কিন্তু বন্যায় জলাবদ্ধতা না হলেও আমাদের ক্ষতি যা হবার তাতো হয়েই গেছে। হাঠৎ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ নির্মলপাল চৌধুরী, গোলাম নবী, পদন্য পাল, নিখিল মালাকার,নমিতা রাণী পাল জানান রাতের হঠাৎ বাধঁ ভেঙ্গে নদীর পানি প্রবেশ করে আমাদের রান্নাঘর,বসতভিটাসহ বাড়িঘর ডুবিয়ে দেয়। এখন বানের পানি অনেকটাই কমে গেলেও আমাদের চরম দূর্ভোগে ফেলেছে। তারা অভিযোগ করে বলেন প্রতিবছরই আমরা এরকম দূর্ভোগ আর ক্ষতিগ্রস্থ হলেও নদী শাসনের স্থায়ী কোনো উদ্যোগই নেই কর্তৃপক্ষের। টুকটাক যে মেরামত করা হয় তা বর্ষা মৌসুমে হওয়ায় কোনো উপকারে আসেনা। তারা কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন নদী আমাদের সব নিয়ে গেছে। এখন কোন রকম মাথাগুজার ঠাঁইটা ঠিকে আছে। দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামত না করলে তাদের বাড়িঘরও নদী গর্ভে বিলিন হয়ে যাবে। এখন ওই ভাঙ্গন দিয়ে পানি বের না হলে বা বন্যা কমে গেলেও রামপাশা এলাকার প্রায় ১২-১৫ শ ফুট নদীর বাধঁ রয়েছে চরম ঝুঁকিতে। কমলগঞ্জ পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রাসেল মতলিব তরফদার ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মহিলা কাউন্সিলর শিউলি আক্তার শাপলা জানান ধলাই নদীর বন্যা এই আছে এই নাই। আকর্ষিক বন্যার হাত থেকে রক্ষায় দ্রুত ঝুকিপূর্ণ বাধঁ মেরামতের প্রয়োজন। তারা জানান ওই ভাঙ্গন এলাকায় ২৪০ ও ৭২ মিটার স্থানে বাঁধ মেরামতের কাজ চলছে। স্থানীয় জনগণের সাথে একাত্ম হয়ে আমাদেরও দাবি মেরামত কাজ যেন শুষ্ক মৌসুমেই হয়।
পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন জানান রামপাশা ছাড়াও পৌর এলাকার ৬নং ওয়ার্ডের আইডিয়াল স্কুলের পাশ ও ৮নং ওয়ার্ডের পুরাতন মসজিদের পাশের নদীর বাঁধ চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন বর্ষা মৌসুমে নদীর বাঁধ আমরাও বাঁধি ও ওরাও বাঁধে। কিন্তু কোন কাজে আসেনা। ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পরিকল্পনা নিয়ে স্থায়ী ভাবে নদী শাসনের প্রয়োজন। পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্ত্তী জানান ধলাই নদীর ৫৭ কিলোমিটার স্থায়ী নদী শাসনের পরিকল্পনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। নকশা প্রণয়ণের কাজ শেষ হলে প্রকল্প প্রণয়ন হবে। যে খানে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকবে। তিনি জানান এখন অস্থায়ী ভিত্তিতে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্থ ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামত করা হবে।



মন্তব্য করুন