সম্ভাবনার মাঝেও নানা সংকটে মৌলভীবাজার জেলার পর্যটন খাত

সাইফুল ইসলাম : প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি মৌলভীবাজার। চা-বাগান, পাহাড়-টিলা, বন, হাওর, ঝরনা ও লেকের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ জেলার পর্যটন সম্ভাবনা দেশজুড়ে পরিচিত।
শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, কমলগঞ্জের মাধবপুর লেক ও হামহাম জলপ্রপাত, বড়লেখার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত এবং হাকালুকি হাওরসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে সারা বছরই পর্যটকদের আনাগোনা রয়েছে। তবে বিপুল সম্ভাবনার বিপরীতে নানা অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সংকটে জেলার পর্যটন খাত কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না।
পর্যটকদের অন্যতম অভিযোগ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার ঘাটতি। অনেক স্থানে পর্যাপ্ত গণশৌচাগার, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, বসার স্থান, নিরাপদ পার্কিং ও তথ্যকেন্দ্র নেই। ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকের চাপ বেড়ে গেলে যানজট ও পার্কিং সংকটও দেখা দেয়।
দূরবর্তী পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থাও বড় চ্যালেঞ্জ। কোথাও রাস্তার মান খারাপ, আবার কোথাও পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা নেই। ফলে নতুন পর্যটকদের অনেক সময় স্থানীয়দের ওপর নির্ভর করতে হয়।
পর্যটন মৌসুমে বিভিন্ন স্পটে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ও খাবারের প্যাকেট ফেলে রাখার ঘটনা ঘটে। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন ও নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা না থাকলে এসব বর্জ্য হাওর, বন ও জলাশয়ের পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও হাকালুকি হাওরের মতো জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এলাকায় পর্যটন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, শব্দদূষণ ও প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রয়েছে পরিবেশ সচেতন মহলের।
এদিকে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোর উন্নয়নে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম থাকলেও সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। পর্যটন স্পটগুলোকে আলাদাভাবে উন্নয়ন না করে একটি সমন্বিত পর্যটন সার্কিটের আওতায় আনার দাবি তাদের।
স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, পর্যটনের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতির সংযোগ আরও বাড়ানো দরকার। চা, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে পর্যটন প্যাকেজের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় মানুষের আয় বাড়ানো সম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌলভীবাজারের পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যটন স্পটে নাগরিক সুবিধা, নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড তৈরি এবং বছরজুড়ে পর্যটক আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও পর্যটন সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে মৌলভীবাজার শুধু দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্যই নয়, স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আবার টাঙ্গুয়ার হাওর যেভাবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, হাকালুকি হাওর তেমনটা পায়নি। অথচ হাকালুকিতে ছয় ঋতুতে ভিন্নরকম সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব। বাইক্কা বিলে রয়েছে মাছ ও পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য। এছাড়া রয়েছে রাজনগর উপজেলায় অন্তহরি ‘জলের গ্রাম’-এর বিশেষত্ব।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, মৌলভীবাজারের ১০ শতাংশ সৌন্দর্যও উপভোগ করতে পারে না একজন পর্যটক। তাই তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত স্পটগুলোর ব্যাপক প্রচার হওয়া দরকার। সেগুলোর স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড ইমেজ গড়ে তুলতে কমিউনিটি ট্যুরিজম বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে।
মৌলভীবাজার ট্যুর কমিউনিটির পক্ষ থেকে পর্যটন শিল্পের বিকাশে সমস্যাগুলো জেলা প্রশাসনের কাছে তুলে ধরলেও কোনও কাজ হয়নি বলে জানালেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্যুর গাইডরা। তাদের মতে, ‘শহরে ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার স্থাপন, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ, সব পর্যটনকেন্দ্রে দিক-নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং পর্যটন জেলা হিসেবে সরকারি গেজেট প্রকাশের কথা জানালেও কোনও উদ্যোগ নেয়নি জেলা প্রশাসন ও পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে পর্যটকদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।’
বিশেষ করে জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বিভিন্ন রাস্তাঘাট নোংরা এবং চারপাশ জঙ্গলে ভরা। এতে পোকামাকড় ও সাপের ভয়ে ঝুঁকি নিয়ে আসতে কিছুটা ভয় পাচ্ছেন পর্যটকরা।’
মৌলভীবাজার জেলা পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি মো. সেলিম আহমদ বলেন, জেলার পর্যটন শিল্প আগের তুলনায় অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এর টেকসই উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। হোটেল ও রিসোর্ট মালিকরা নিজ নিজ প্রপার্টির ভেতরের সমস্যাগুলো চিহ্নিত ও সমাধান করতে পারলেও, বড় পরিসরের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ অপরিহার্য। রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা, বিদ্যুৎ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সংস্কার এবং ট্রেনের টিকিট সংকট—এসব সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব সরকারের, যেখানে উদ্যোক্তারা কেবল সমস্যাগুলো তুলে ধরতে পারেন। পাশাপাশি, পর্যটন খাতে দক্ষ জনবলের সংকট দূর করতে তিনি মৌলভীবাজার পলিটেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পর্যটন বিষয়ক কোর্স চালুর প্রস্তাব করেন, যার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে এই শিল্পকে আরও বহুদূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন জানান, পর্যটন খাতের উন্নয়নে নতুন কিছু পরিকল্পনা ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর পাশাপাশি, জেলা ও উপজেলার সব পর্যটন স্পটের মান ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
জানা গেছে, ২০০৮ সালে জেলাটিকে ‘পর্যটন জেলা’ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও দীর্ঘ ১৮ বছরেও এর কোনো আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশিত হয়নি। ২০০৯ সালে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘মৌলভীবাজার জেলাকে পর্যটন জেলা হিসেবে উন্নীতকরণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে তা আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি ২০১৭ সালে পর্যটনশিল্পের বিকাশ, সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করে একটি কর্মকৌশল (অ্যাকশন প্ল্যান) প্রণয়ন করা হলেও প্রায় এক দশকেও তা বাস্তবায়িত হয়নি; পরিকল্পনাটি কেবল ফাইলবন্দিই রয়ে গেছে। পর্যটনসমৃদ্ধ এই অঞ্চলে টেকসই পর্যটনশিল্প গড়ে তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।



মন্তব্য করুন