আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্থরা : মৌলভীবাজারে শত কোটি টাকার ‘মনু নদী প্রকল্প’ কাজে আসছে না কৃষকদের

ইমাদ উদ দীন॥ শত কোটি টাকার মনু নদী প্রকল্প। উদ্দেশ্য জলাবদ্ধতা ও খরায় ফসলী কৃষি জমি রক্ষা। আর প্রয়োজনীয় সেচ সুবিধার মাধ্যমে নিবিড়তা বাড়িয়ে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির। কিন্তু এমন পরিকল্পনা এখন হিতে বিপরীত। নানা কারণে পুরো প্রকল্পের কার্যক্রমই এখন আর উপকারে আসছেনা কৃষকদের। এমন অভিযোগ প্রকল্পের আওতাধীন মৌলভীবাজার ও রাজনগর এই দু’উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের উপকার ভোগী কৃষকদের। বর্ষায় জলাবদ্ধতা আর শীতকালে খরা। প্রতিবছর বন্যা কিংবা খরায় এ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের হৈ চৈই। তারপরও যেই সেই। নেই কোন পরিবর্তন। দূর্ভোগগ্রস্থ কৃষকদের ক্ষতি থেকে উত্তরণের নেই কোন সুসংবাদ। বিশাল ব্যয়ের এই প্রকল্পটি এখন কৃষকদের দু:খের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কৃষকদের দু:খ নিবারণে কল্যাণের জন্য গড়ে উঠা নদীশাসনের এই প্রকল্পটি এখন যেন কৃষকদের ফসল হানির মরণ ফাঁদ। তাই বার স্বপ্ন ভঙ্গের কারণে পেশা বদলের সিন্ধান্ত নিচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। তারা জানালেন বন্যা কিংবা খরাতে ফসল রক্ষা করতে না পারায় জীবনের তাগিদে এখন এমন কঠিন সিন্ধান্ত নিতে হচ্ছে তাদের। দূর্ভোগ গ্রস্থ কৃষকরা জানালেন প্রতিবছরই বন্যায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও খরায় তারা বুনা ফসল ঘরে তুলতে পারেন না। বার বার এ ক্ষতি পোষাতে না পারায় এখন তারা কৃষিক্ষেতের আশা ছেড়ে বিকল্প পেশা খোঁজছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে আগে (বর্তমান মনু নদী প্রকল্পের আওতাধীন) ওই এলাকায় বন্যা, জলাবদ্ধতা ও খরায় কৃষকদের চাষকৃত ফসল ঘরে তুলা সম্ভব হতনা। প্রকল্প এলাকার অধিকাংশ কৃষি জমিই নীচু।এর মধ্যে ৪৮৫৮ হেক্টর কৃষি জমি অতি নীচু হাওর এলাকা হওয়ায় ৪ থেকে ৬ মিটার গভীর পানিতে ডুবে থাকে। অথচ ওই এলাকার প্রধান ফসলই ধান।
কিন্তু আউশ, আমন, বোরো ও রবিশস্য জলাবদ্ধতা ও খরায় ব্যহত হত উৎপাদন। ওই এলাকায় ১১২০০ হেক্টরে দু’টি ,৩৯০০ হেক্টরে একটি এবং ৪০ হেক্টরে তিনটি ফসল উৎপাদন হত। ফসলের নিবিড়তা ছিল ১২৬ শতাংশ। ওই এলাকায় চাষীরা প্রকৃতির খেয়ালের উপরই কৃষি ব্যবস্থা ও চাষ পদ্ধতি নির্ধারণ করেছিল। অবহেলীত চাষীদের এমন দূর্দশা লাগবে কৃষক,কৃষিজমি ও ফসল রক্ষা ও উন্নয়নের স্বার্থে তৎকালীন সংশ্লিষ্ট ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হন। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ১৯৬২ সালের রিপোর্টের ভিত্তিতে এই প্রকল্পের বিস্তারিত রিপোর্ট ১৯৭২ সালে প্রণয়ন করা হয়। এর ভিত্তিতে প্রকল্পের নির্মাণ কাজ ১৯৭৫-৭৬ সালে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৮২-৮৩ সালে। সুত্রমতে মনু প্রকল্পের প্রকল্প এলাকা ২২,৬৭২ হেক্টর, কৃষিজমি মোট ১৯,২৭৮ হেক্টর ,নীট ১৫,৫৪৬ হেক্টর,সেচ ব্যবস্থাধীন জমি ১১,৫৭৮ হেক্টর। বাঁধ ৫৯ কিলোমিটার। সেচ খাল ১০৫টি। ব্যারেজ ১টি,পাম্পিং প্যান্ট ১টি। নিষ্কাশন সাইফুন সুইস ৭টি, নিষ্কাশন সাইফুন ৯টি। অন্যান্য ষ্ট্রাকচার ৩০৯টি। তৎকালীন নির্মাণ ব্যয় ৬৮ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকা। আর এ প্রকল্পটির বার্ষিক পরিচালনা ও রক্ষানাবেক্ষন ব্যয় হয় ১২১.৫০ লক্ষ টাকা। এত বিশাল বাজেটের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও বার্ষিক পরিচালনা ও রক্ষনাবেক্ষন বাবদ বড় অংকের টাকা ব্যয় হওয়ার পরও তা বর্ষা কিংবা শীত মৌসুমে নূন্যতম উপকারে আসছেনা কৃষকদের।এর অন্যতম কারণ হিসেবে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্থদের অভিযোগ এই প্রকল্পটির পরিকল্পনা প্রণয়নে রয়েছে নানা ত্রুটি বিচ্যুতি। তাছাড়া প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পর এর পরিচালনা ও রক্ষনাবেক্ষনের দ্বায়িত্বে থাকা স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনিয়ম ও দূর্নীতির কারণে বেহাল দশায় এই প্রকল্পটির কার্যক্রম। জলাবদ্ধতা নিরসনে ফতেহপুর ইউনিয়নের কাশিমপুরে ৯টি পাম্পের মধ্যে ৮টি পাম্প স্থাপন হলেও এরমধ্যে ৪টিই বিকল। আর যে ৪টি পাম্প ভালো সে গুলোও বছর জুড়ে নানা কারণে থাকে অচল। যদিও সংশ্লিষ্ট বিশেজ্ঞদের ধারণা প্রকল্পের আওতাধীন এলাকার জলাবদ্ধতা ও সেচ সমস্যা নিরসনে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ১২-১৪টি পাম্পের প্রয়োজন। কিন্তু যে গুলো আছে সে গুলোও রয়েছে বিকল। সেচ খাল ও বাধগুলোও দীর্ঘ সংস্কার হীনতায় বর্ষা মৌসুমে উপছে পড়ে পানি। আর শীত মৌসুমে পানি শূন্যতায় মরুভূমি। এমনটিই এই প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা। সরজমিনে প্রকল্প এলাকাগুলোতে গেলে অন্তহরী এলাকার ইউপি সদস্য অমল দাস (৫০), ইসলামপুর গ্রামের মোহাম্মদ আলী (৬৫), আখল মিয়া (৬০), কাশেমপুরের জমসেদ আলী (৫৬), ফরিদ মিয়া (৫০), আখাইলকুড়া রসুল পুর গ্রামের মুহিব খান (৪৬), ইসলামপুরের রইছ মিয়া,(৬২), কটু মিয়া (৬৫) সহ অনেকেই জানালেন এই পাম্প হাউজটিই তাদের জন্য অভিশাপ। জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ১৩১.৬৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই পাম্প হাউজটির কারণেই এখন ওই এলাকার কৃষক, কৃষিজমি ও ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা ধ্বংসের দোরগোড়ায়। ধানীজমির পাশাপাশি এ কয়েক বছর থেকে তাদের বাড়ি ঘর , রাস্তাঘাট, পুকুর, স্কুল,মাদ্রাসা মসজিদ,মন্দিরও পানিতে ডুবে যায়। তারা জানালেন প্রতিবছর ধান চাষ করে পাকা ধান কাটার সময় তা পানিতে তলিয়ে যায়। তখন পাম্প সচল রেখে সেচের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা দূরকরার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করেও কোন ফল পাওয়া যায়না। বিদ্যুৎ নেই,পাম্প বিকলসহ নানা অজুহাতে তারা পাম্পগুলো বন্ধ রাখে। আর ধান গুলি পানিতে তলিয়ে গেলে বিল ইজারাদারদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাদেরকে সেচের মাধ্যমে মাছ ধরতে সহযোগীতা করে। তারা অভিযোগ করে বলেন ওই সকল দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কারণে বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে পাম্প হাউজটি আমাদের কোন উপকারে আসে না। এমনকি পুরো প্রকল্পটিই আমাদের জন্য এখন মরণ ফাঁদ। কয়েক একর জায়গার মালিক অথচ সারা বছর চাল কিনে খেতে হয়। প্রকল্প হওয়ার আগে এক দু’ফসল ধান ঘরে তুলা গেলেও এখন তা সম্ভব হচ্ছেনা। অথচ এই প্রকল্প আওতাধীন হাওর এলাকায় ধান চাষ হলে এ জেলার চাহিদা মিটিয়ে তা দেশের চাহিদার যোগান সহায়ক হত বলে জানালেন তারা। কাশিমপুর পাম্প হাউজের শুর” থেকেই অপারেটর দ্বায়িত্বে থাকা মতিউর রহমান বলেন ৮টি পাম্পের মধ্যে ৫টি সচল। তবে দীর্ঘ দিন থেকে পাম্প গুলি সার্ভিসে থাকায় পাম্পগুলির কর্মক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। তাছাড়া বিদ্যুৎ সমস্যা থাকায় পাম্পগুলো প্রয়োজনীয় সময়ে সবসময় সচল রাখা সম্ভব হয়না। এবিষয়ে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) ফয়জুর রবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন সব সমস্যা এই পাম্প হাউজকে ঘীরে। এই পাম্প সহ আরো ক’টি পাম্প যদি প্রয়োজনীয় সময়ে সর্বদা সচল রাখা যেত তা হলে এই সমস্যা হত না। তাছাড়া স্থাপনকৃত পাম্পগুলো পুরাতন হয়ে যাওয়ায়সহ পাম্প সচল রাখতে পর্যাপ্ত বিদ্যুতের ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন। তাছাড়া মনু নদী প্রকল্পের খাল ও বাধ গুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান এগুলো সংষ্কার হলে উভয় মৌসুমে পানি সমস্যারও স্থায়ী সমাধান হত। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন নতুন পাম্প হাউজ, খাল ও বাধ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। কৃষকদের কল্যাণে এই প্রকল্পটি সচল রাখতে আমরা যথেষ্ট আন্তরিক। মনু প্রকল্প ও হাওর রক্ষা সমন্বয় পরিষদের সমন্বয়ক সরওয়ার আহমদ,আহবায়ক বকসি ইকবাল আহমদ ও সদস্য সচিব নকুল চন্দ্র দাশ জানান দীর্ঘ দিন থেকে এ প্রকল্পের বেহাল দশায় এ অঞ্চলের কয়েক লক্ষ অসহায় কৃষিজীবী মানুষ নি:স্ব হয়ে পথে বসার উপক্রম। সংশ্লিষ্টরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে শিগগিরই উদ্যেগী না হলে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের জীবন জীবীকা বাচাঁতে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা আমাদের নায্য দাবী আদায় করব। এদিকে মনু প্রকল্প ও হাওর রক্ষা সমন্বয় পরিষদ ব্যানারে মনু নদী প্রকল্পের ত্র”টি বিচ্যুতি চিহ্নিত করে তা দ্র”ত সংস্কার, নতুন উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন পাম্প হাউজ স্থাপনসহ নানা দাবীতে এই প্রকল্পের আওতায় মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার কয়েক হাজার ক্ষতিগ্রস্থ কৃষিজীবী মানুষ নেমেছেন আন্দোলনে। তারা ২৭ আগষ্ট সকালে কাশিমপুর পাম্প হাউজের পাশে স্থানীয় ওয়াপদাবাজারে ক্ষতিগ্রস্থদের নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে ওই সংগঠন। প্রতিবাদ সমাবেশে দিনের আন্দোলনের নানা কর্মসূচীও তারা ঘোষণা করেছেন।



মন্তব্য করুন