স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে হাওর তীরের বানভাসি মানুষ

ইমাদ উদ দীন॥ এবছর নানা সমস্যা আর সংকট সঙ্গী হয়েছে হাওর তীরের মানুষের। একের পর এক প্রাকৃতিক দূর্যোগে বির্পযস্ত তারা। ৩য় দফা বন্যায় এখন নতুন উপদ্রব পানি বাহিত রোগ বালাই। বন্যাকবলিত নিন্মাঞ্চলের লোকজন এখন পানি বাহিত নানা রোগ বালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন। দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে পানি বাহিত রোগীর সংখ্যা। এর অন্যতম কারন বিশুদ্ধ খাবার পানি ও স্যানিটেশন সংকট। বন্যার্তদের খাবার পানি বিশুদ্ধ করার জন্য দেওয়া হচ্ছে ওষুধ। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। আর রান্না ঘর ডুবে যাওয়ায় বিকল্প পদ্ধতিতে রান্নার কাজে নিত্য প্রয়োজনীয় রান্না ছাড়া পানি ফোটানোর পর্যাপ্ত সুযোগও নেই। আর টয়লেট গুলো পনিতে ডুবে যাওয়া চরম স্যানিটেশন সংকট। এখন বন্যার পানিতে হাওর পাড়ের ঘরবাড়ি একাকার। এবছর দফায় দফায় বন্যা। এমন প্রাকৃতিক দূর্যোগে সর্বস্বান্ত হাওর তীরের কৃষি ও মৎস্যজীবী পরিবার। বানের পানিতে একে একে তলিয়ে গেছে সব। এবছর প্রথমদিকের দুটি বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিহয় বোরো ধানের। ধানপচে পানি দূষিত হয়ে মরে মাছ, হাঁস, জলজ প্রানি ও উদ্ভিদ। আর চলমান ৩য় দফার বন্যায় ডুবিয়ে দেয় ঘরবাড়ি,রাস্তাঘাট,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীউপসনালয়। সাথে বিশুদ্ধ খাবার পানির উৎস টিবওয়েল। তলিয়ে যায় রান্নাঘর আর টয়লেট। এনিয়ে হাওর তীরের বন্যাকবলিত লোকজনের দূর্ভোগের অন্তনেই। বানের পানিতে বিশুদ্ধ খাবার পানি আর টয়লেট ডুবে থাকায় তারা পড়েছেন চরম বিপাকে। তাই যেমন খাচ্ছেন বন্যার দূষিত পানি। তেমনি বাধ্য হয়ে বন্যার পানির উপরই (প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছেন) সারছেন টয়লেটের কাজ। স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে বানভাসি মানুষ এখন আক্রান্ত হচ্ছেন পানিবাহিত নানা রোগে। ডাইরিয়া,জ্বর,সর্দি,কাশি,আমাশয়,চর্মরোগ,কৃমি ও পেট ব্যথাসহ বিভিন্ন রোগ তাদের পিছু নিয়েছে। ঘরে খাবার নেই। পেটে রাজ্যের ক্ষুদা। তাই রোগ তাড়াতে ওষুধ কিনার সাধ্য কোথায়।

একারনে রোগের সাথে আপোষ করেই তাদের চলা।এবছর চৈত্রের অকাল বন্যার পর ৩য় দফার চলমান বন্যায় এখন এমন স্বাস্থ্য অবস্থা হাওর তীরবর্তী বন্যাকবলিত গ্রামগুলোর। আয় রোজগার নেই তাই হাতে টাকাও নেই। এমন অসহায়ত্বে রোগ সারাতে মনোবল আর ধৈর্য্যই একমাত্র পুঁিজ। মাঝে মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণায় অধৈর্য্য হলে রোগ সারাতে স্থানীয় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্র বা উপজেলা সরকারী হাসপাতাল গুলোতে গেলে সেখানে মিলেনা ডাক্তার কিংবা ওষুধ। আর অনেক সময় ডাক্তার পাওয়া গেলেও তাদের রুঢ় আচরনে হতে হয় নাজেহাল। জানা গেল হাকালুকি হাওরের মৌলভীবাজার অংশের কুলাউড়া,জুড়ী ও বড়লেখা ৩টি উপজেলার মধ্যে ২টি উপজেলায় রয়েছে সরকারী হাসপাতাল। কিন্তু এই দুটি হাসপাতালেও রয়েছে ডাক্তার,ওষুধ ও লোকবলসহ নানা সমস্যা ও সংকট। আর যা আছে তারও স্বদব্যবহার হচ্ছেনা বলে ভোগত ভোগীদের তরফে রয়েছে নানা অভিযোগ। এবছর হঠাৎ চৈত্র মাসে অকাল বন্যার পর একাধীক বন্যা । হাওর উত্তাল হয়ে সব গিলে খাচ্ছে হাওর তীরের বাসিন্ধাদের। এমন বির্পযয় এর আগে কখনো দেখেনি তারা। তাই ঘরে যেমন খাদ্য নেই। তেমনি না থাকার তালিকা আছে ওষুধ ও অনান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসও। তাই হাওর জুড়ে এখন শুধুই হাহাকার। কর্মহীন মানুষগুলো পুরোপুরিই বেকার। এমন অভাব অনটনের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা অসুখ বিসুখ।
সরজমিনে হাওর তীরের কুলাউড়া,জুড়ী ও বড়লেখা অংশের একাধীক ইউনিয়নের গ্রাম গুলোতে দেখা গেল বন্যাকবলিত মানুষের ঘর বাড়িতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। পানিতে ডুবে থাকায় বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের সু ব্যবস্থা নেই বল্লেই চলে। বানভাসি অনেকেই জানালেন তারা বানের পানি যেমন খাচ্ছেন। তেমনি তা দিয়ে রান্নাবান্নাসহ অনান্য প্রয়োজনীয় কাজও সারছেন। কারন তাদের টিবওয়েল পানিতে ডুবে থাকায় এমন বেহাল অবস্থা। আর পুরো গ্রামের মধ্যে যে দু’একটি টিবওয়েল উচুঁ স্থানে কোন রকম ভেসে আছে সেখান থেকে বানের পানি ঠেলে গিয়ে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করাও কষ্ঠকর। তারা জানালেন গেল কদিন থেকে তাদের পরিবারে সদস্যরা নানা রোগ বালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন। ওষুধ কিনার সাধ্য নেই তাই ওরস্যালাইন খেয়ে রোগ তাড়াচ্ছেন। জানা গেল এখন প্রতিনিয়তই তারা আক্রান্ত হচ্ছেন ডাইরিয়া,জ্বর,সর্দি,কাশি,আমাশয়,চর্মরোগ,কৃমি ও পেট ব্যথাসহ বিভিন্ন রোগে। ওই এলাকার স্থানীয় হাট বাজারের ছোট বড় র্ফামেসী গুলোর মালিকদের সাথে আলাপে জানা গেল এখন তাদের ফার্মেসীতে পানিবাহিত রোগের ওষুধ বিক্রি হচ্ছে অন্য সময়ের চাইতে তুলনামূলক বেশি। হাকালুকি হাওর তীরের ভূকশিমইল ইউনিয়নের
সাদিপুর,মীরশংকর,গৌড়িশংকর, জুড়ীর জায়ফর নগর ইউনিয়নের বেলাগাঁও,শাহপুরসহ বড়লেখার তালিমপুর ও পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে দেখা গেল তাদের দৈনদশা। তাদের মত এমন দূর্দশায় ৩ উপজেলার ২৫ টি ইউনিয়নের প্রায় ২শতাধীক গ্রাম। বিশেষ করে হাওর পাড়ের জেলেপল্লী হিসেবে পরিচিত সাদিপুর গ্রামের অনেকের রান্না ঘরের পাশে দেখা গেল বন্যার পানিতে স্যাঁত স্যাঁতে পরিবেশ আর অস্বাস্থ্যকর খোলা পায়খানা। আর বিশুদ্ধ পানির উৎস টিবওয়েল খুবই কম। বানের পানি বসত ঘরের ভেতর ও বাহিরে। অনেকেই ঘরের খাটেই বিশেষ কৌশলে রান্নাবান্না চালাচ্ছেন। আর ওখানেই নিয়েছেন নিরাপদ ঠাঁই। বন্যার কারনে এখন তাদের বিশুদ্ধ খাবার পানি,স্বাস্থ্য সমেত স্যানিটেশন যেমন নেই। তেমনি অস্বাস্থ্যকর অবস্থা তাদের বতসবাড়ির পরিবেশ। এমন পরিবেশই জানান দিচ্ছে তাদের পানিবাহিত রোগের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি। তবে স্থানীয় চিকিৎসক ও সচতেন মহলের সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবী যাতে মহামারি দেখা দিবার আগে দ্রুত এবিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার। বানভাসি মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়ে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন সত্যকাম চক্রবর্তী বলেন, এবছর অকাল বন্যায় বোরো ধান পচে হাওরের পানি দূষিত হওয়ায় পর একাধীক বার বন্যা হচ্ছে। সর্বশেষ ৩য় দফার বন্যায় তাদের টিবওয়েল ও স্যানিটেশন বির্পযস্ত হয়েছে। তাই পানি বাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা অবগত আছি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাদেরকে সার্বিক স্বাস্থ্য সেবা দিতে আমাদের প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রয়েছে।



মন্তব্য করুন