ঈদ হয়নি হাকালুকি ও কাউয়াদিঘির পাড়ে

ওমর ফারুক নাঈম॥ “আমরার ঈদ নাই। ঈদ করতাম কিতা সবতা পানির তলে। ফানিয়ে হক্কলতা নিছেগি। মরিয়াও বাঁচিয়া কুনুরখম আছি । ভালাখরি খাইতাম ফারিয়ার না, ফিনতাম ফারিয়ার না। বউত খষ্টে দিন যার। ঈদ কুনবায় আইছে, কুনবায় গেছে, ইতা কইতাম কিলা”
মৌলভীবাজার জেলার হাকালুকি ও কাউয়াদীঘি হাওর পাড়ের বাসিন্দা এভাবেই আহাজারি করে নিজেদের দুরবস্থার কথা প্রকাশ করলেন। ঘরে তিন বেলা দু’মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা যাদের নেই, তাদের আবার নতুন জামা-কাপড় ও কুরবানী দিয়ে ঈদ উদযাপন করার সাধ্য কোথায়। গেল বছরের পুরনো কাপড় দিয়ে করেছেন ঈদ। কিনে দিতে পারেননি ছেলে-মেয়েকে নতুন জামা। এই হাহাকার ৃদিন কাটাচ্ছেন হাওরপাড়ের বাসিন্দারা।
সম্প্রতি হাকালুকি ও কাউয়াদীঘি হাওর পাড়ে গেলে অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওরপাড়ের মানুষের দূর্দশার চিত্র উঠে আসে। ওখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে নেই কোনো খুশির আমেজ। সবাই দুশ্চিন্তায় সময় পার করছেন। কারণ অকাল বন্যায় কেউই ফসল তুলতে পারেননি। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই নতুন কাউকে দেখলেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। হয়তো ভাবেন, এই বুঝি কেউ রিলিফ নিয়ে এগিয়ে এলো। ছুটে আসেন নিজের ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে।
ঈদ উল ফিতর কিংবা ঈদ উল আযহা কোন ঈদেই খুশির কোনো বিন্দুমাত্র আমেজ ছিল না হাকালুকি হাওরপাড়ের বন্যাকবলিত জনপদে। কারণ ওখানকার বেশিরভাগই কৃষক, মৎস্যজীবি এবং হাওরের ওপর নির্ভর। দফায় দফায় বন্যা কবলিত হয়ে তারা প্রায় নিস্ব। এদিকে বিভিন্ন ধরনের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন হাওরতীরের মানুষ। খাদ্য সংকটে সর্বস্বান্ত হাওর পাড়ে এখন নতুন উপদ্রব রোগ বালাই।
এবছর চৈত্রের অকাল বন্যার পর কয়েক দফার দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় এমন অবস্থা হাওর তীরবর্তী গ্রামগুলোর কৃষি ও মৎস্যজীবীদের। টাকা নেই তাই শরীরও ভালো নেই। রোগ সারাতে মনোবল আর ধৈর্য্যই যেন একমাত্র পুঁজি।
এবছর হাওর উত্তাল হয়ে সব গিলে খেয়েছে হাওর তীরের বাসিন্ধাদের। ধানের পর মাছ। পোষা হাঁস, জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ, সবই। হাওর থেকে ভেসে আসা মরা পঁচা উৎকট গন্ধ এখনো নাকে লাগছে। এমন বির্পযয় এর আগে কখনো দেখেনি তারা।
হাওরে এ বিপর্যয়ের পর এখন জালে মাছ ধরা পড়ছে কম। এই মাছ বিক্রি করে জাল ভাড়াও উঠছেনা। তাই ঘরে যেমন খাদ্য নেই। তেমনি না থাকার তালিকায় আছে ওষুধ ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ। তাই হাওর জুড়ে এখন শুধুই হাহাকার।
হাকালুকি ও কাউয়াদিঘির তীরবর্তী অধিকাংশ বাসিন্দাদের বসত ভিটা ছাড়া নেই তেমন ক্ষেত কৃষির জমি জমা। বোরো মৌসুমে অন্যের জমিতে বর্গা চাষ আর বছর জুড়ে হাওরে মাছ ধরাই তাদের কাজ। এ দু’কাজেই চলে তাদের জীবন জীবীকা। কিন্তু যে হাকালুকিকে ঘিরে তাদেও বেচেঁ থাকার স্বপ্ন আর এই জনবসতি। সেই হাকালুকিরই নেই সেই আগের অবস্থা।
দেশীয় প্রজাতির মাছ আর নানা দূর্লভ জীববৈচিত্রের অভায়াশ্রম হিসেবে পরিচিত এশিয়ার অন্যতম হাওর হাকালুকি নাব্যতা হারিয়ে ঐতিহ্য এখন ধ্বংসের দোরগোড়ায়। আর এরপর এবছর অকাল বন্যায় সব সম্পদ হারিয়ে হাওর অনেকটা নিঃস্ব।
হাকালুকির এমন বেহাল দশায় ঈদের কোনো আমেজ নেই হাওর তীরের জেলেপল্লীর জনগোষ্ঠী ও কৃষিজীবীরা। হাওরের দুরাবস্থায় তাদের জীবন জীবকায়ও লেগেছে দৈন্যদশা। এমনিতে বছরের ৫ মাস কোনরকম মাছ ধরে সংসার চালালেও বাকী ৭ মাসই বেকার। এ বছর বোরো ধান পচে পানি দূষিত হয়ে মারা যায় মাছ। একারনেই তারা এখন পুরোপুরিই বেকার। এমন অভাব অনটনের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা অসুখ বিসুখ।
হাওরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেল অধিকাংশ ঘর বাড়িতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের সু-ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। দারিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত প্রতিটি শিশুই পুষ্টিহীনতায় জীর্নশীর্ণ। হাকালুকি তীরের কুলাউড়া উপজেলার ভূকশিমইল ইউনিয়নের সাদিপুরসহ কয়েকটি গ্রামে দেখা গেল তাদের এমন দৈনদশা। বিশেষ করে জেলেপল্লী হিসেবে পরিচিত সাদিপুর গ্রামের অনেকের রান্না ঘরের পাশে স্যাঁত স্যাঁতে পরিবেশ আর অস্বাস্থ্যকর খোলা পায়খানা। খোলা ড্রেন দিয়ে ময়লা আবর্জনা পুকুরগুলোতে এসে পড়ছে। আর ওই নোংরা পানিতেই হাত পা ধোয়া, নিজেদের গোসল ছাড়াও গোসল সারাচ্ছেন গরু মহিষেরও। গৃহিণীরা গৃহস্থালির আসাবাবপত্র, কাপড়সহ বাসনপত্র আর খাবারের জিনিসপত্রও ধুচ্ছেন ওই পুকুরেই। স্যাঁত স্যাঁতে কর্দমাক্ত আর দুর্গন্ধময় পরিবেশ পুকুর জুড়ে। তারপরও পানির উৎস বা নিরাপদ পানি বলতেই তারা এই পুকুরটিকেই বেচে নিয়েছেন। কারণ প্রায় শতাধিক পরিবারের বিশুদ্ধ পানির ভরসা একটি মাত্র টিউবওয়েল।
স্থানীয় বাসিন্ধারা জানালেন সবসময় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিবওয়েলের পানি দিয়ে এতসব প্রয়োজনীয় (ধুয়া মুছার) কাজ সারা সম্ভব নয়। তাই ওই পুকুরই তাদের ব্যাপক পানির উৎস। জন্ম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে অনেকটাই অসেচতন ওই এলাকার নারী-পুরুষ। একই পরিবারে পাশাপাশি বয়সের রয়েছে ৬-৭ টি শিশু সন্তান। অনেক পরিবারে ১০-১২ জন সদস্য আর হাঁস-মোরগ ও ছাগলের জন্য ছোট একটি মাত্র বাঁশের বেড়ার জরাজীর্ণ ঘর। যে খানে কোনরকম গাদাগাদি করে একসাথে বসবাস তাদের।
মৌলভীবাজারের ভুকশিমইল গ্রামের নজরুল ইসলাম, রাজনা বেগম, তুলা মিয়া, কামাল আহমেদদের বাড়িতে আজ নেই ঈদের আমেজ।
প্রতিবছর ঈদুল আযহায় কোরবানি দিলেও এবার আর কোরবানি দেওয়া হয় নি তাদের বাড়িতে। ঘরে চাল নেই, চুলো জ্বলে না। এ বছর হাওর পাড়ে ঈদ বলতে বন্যার পানির সাথে লড়াই করা ছাড়া আর কিছু নয়। শুধু তাদের বাড়িতেই নয় জেলার হাকালুকি ও কাউয়াদিঘী হাওর তীরের কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা, রাজনগর এবং মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৩৫০টি গ্রামের ৩ লক্ষাধিক বন্যা কবলিত মানুষ বন্যার সাথে লড়াই করে টিকে রয়েছে অনেক কষ্টে। যেখানে দুবেলা খাবার জোগাড় করতে হিমশিম করতে হচ্ছে সেখানে ঈদের আনন্দ চিন্তা করাটা যেন তাদের কাছে অনেক বড় স্বপ্ন।
রমজান ঈদ উল ফিতরেও ছিলো তাদের একি অবস্থা। তখনও তারা ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। বন্যা কবলিত এসব এলাকার মানুষ জানান, সরকার বার বার প্রতিশ্রুতি দিলেও পুরো খাদ্য সহায়তা তারা পাচ্ছে না। তাই এসব হাওর পাড়ের মানুষের মাঝে কাজ করছে হতাশা আর দুঃখ বেদনা।
এরকম পরিস্থিতিতে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার চেষ্টা যখন হাওরপাড়ে, তখনই দফায় দফায় পানির আক্রমণ চলছে। সম্প্রতি কয়েকদিনের বৃষ্টিপাকে আবারও ৪র্থ দফার বন্যার কবলে পড়েছে এই জনপদ। জীবিকার হাতিয়ার পানি যেন এখন অভিশাপ। ঈদুল আযহায় বেশিরভাগ পরিবারের চুলায় জ্বলেনি আগুন। আর পানিবন্দী ঐ মানুষগুলোর পাশে যেভাবে এগিয়ে আসার কথা সেভাবে আসছেন না কেউই।



মন্তব্য করুন