জোড়া খুন : গ্রুপ উপগ্রুপের দ্বন্ধে প্রাণ গেল শাবাব ও মাহির

মু. ইমাদ উদ দীন॥ কি কারনে জোড়া খুন। নেপথ্যের ঘটনা কি। গেল ৭ ডিসেম্বর রাত থেকে চলছে এমন চুলচেরা বিশ্লেষন। তবে পরিবার,স্বজন,বন্ধু,সহপাঠী, পুলিশ সকলেরই তথ্য উপাথ্য ঠেকেছে এক জায়গায়। ওদের জবানিতে এখন মিলছে এমন বক্তব্য। তারা সকলেই অনেকটাই নিশ্চিত এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক দ্বন্ধ। নিজদলে একই গ্রুপে নিজের আদিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার আগে থেকেই নিহত ছাত্রলীগ নেতা শাবাব ও তার অনুসারী মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ কর্মী মাহির সাথে দ্বন্ধ হয় তুষার গ্রুপের। আনিসুল ইসলাম তুষার ও মোহাম্মদ আলী শাবাব জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের সক্রিয় সদস্য ও ছাত্রলীগ নেতা। তারা দু’জন ভালো বন্ধু হলেও দলের মধ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে গিয়েই একে অপরের শত্রুতে পরিণত হন। দলের মধ্যে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে একই গ্রুপে তারা নিজেদের মধ্যে করেন উপগ্রুপ। এই উপগ্রুপের একটির প্রধান ছিলেন তুষার। আর অপরটির ছিলেন শাবাব।
সম্প্রতি সিনিয়রদের পরামর্শে দলের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করতে তারা ছিলেন সক্রিয়। এরই প্রেক্ষিতে তারা দুজনই মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় ও সরকারী কলেজে দলের কর্মী ও সমর্থক বৃদ্ধির কাজ চালাচ্ছিলেন। নিজ দলে কর্মী বৃদ্ধিতে চৌকস ছিল শাবাব। সে মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হওয়ায় ওই স্কুলের শিক্ষার্থীরা তার প্রতি আকৃষ্টি ছিল। তাদের সুখ-দুখ, সমস্যা-সম্ভাবনার সবকিছুই তার কাছেই শেয়ার করত। সেও তাদের কে আন্তরিক ভাবে সময় দিত ও নানা ভাবে সহযোগীতাও করত। এতে করে ওই স্কুলে তার সমর্থক ও দলের কর্মী দিন দিন বাড়তে থাকে। এ কারনেই গ্রুপে শাবাবের সমর্থকরা বাড়লেও কমতে থাকে তুষারের সমর্থক।
ওই স্কুলে তুষারের অনুসারীরা থাকলেও তা শাবাবের অনুসারীদের চাইতে অনেক কমছিল। তা মেনে নিতে পারেন নি তুষার। যে ভাবে হউক ওই স্কুলে তার অনুসারী বাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেন। আর এতেই টার্গেট করা হয় শাবাবের সক্রিয় অনুসারীদের। আর এরই প্রেক্ষিতে শুরু হতে থাকে তুচ্ছ ঘটনায় কথাকাটাকাটি,ঝগড়া,হাতাহাতি ও মারামারি। প্রায় বছর খানেক থেকে এই দ্বন্ধ ছিল চলমান। যার চূড়ান্ত রুপ পায় গত ০৭ ডিসেম্ভর। জোড়া খুনের ঘটনার মধ্য দিয়ে স্তম্ভিত হয় দল। থেমে যায় গ্রুপ ও উপগ্রুপের কার্যক্রম। মামলার এজাহারে গ্রুপিং দ্বন্ধের বিষয়টিও উল্লেখিত। ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ আলী শাবাব ও ছাত্রলীগ কর্মী নাহিদ আহমদ মাহি খুনের ঘটনায় মামলার এজাহারে বলা হয়।
শাবাবের সাথে তুষার গ্রুপের বিরোধের জেরেই এই হত্যাকা- ঘটেছে। ঘটনার সাথে জড়িতরা একে অপরের বন্ধু। ১০ ডিসেম্বর নিহত শাবাবের মা সেলিনা রহমান চৌধুরী বাদী হয়ে মৌলভীবাজার মডেল থানায় তুষার গ্রুপের প্রধান আনিসুল ইসলাম তুষারসহ ওই গ্রুপের আরো ১১ জনকে আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আরো ৬-৭ জনকে অজ্ঞাত আসামী করা হয়েছে। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, নিহত মোহাম্মদ আলী শাহবাবের সাথে তুষার গ্রুপের বিরোধের কারনেই দীর্ঘদিন যাবৎ তুষার শাহবাবকে হত্যার চেষ্টা চালাচ্ছে।
গত ১০/১২ দিন পূর্বে নিহত মাহি সাথে তুষার গ্রুপের কর্মী ফাহিমের ঝগড়া হয়। এই বিষয়টি মিমাংসা করার জন্যই ঘটনার দিন ৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিহত মোহাম্মদ আলী শাবাব, নিহত নাহিদ আহমদ মাহিসহ অর্ক, বিপ্লব, পল্লব ও সোহানকে নানা কৌশলে প্রধান আসামী আনিসুল ইসলাম তুষার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় ছাত্রাবাস এলাকায় ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছার পর তুষার গ্রুপের সাথে শাবাবের কথাকাটাটি হয়। এক পর্যায়ে তুষার গ্রুপের কর্মীরা শাবাব ও মাহিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে।এসময় ঘটনাস্থলে থাকা অর্ক, বিপ্লব, পল্লব ও সোহান ভয়ে সাইফুর রহমান রোডে সাউথইষ্ট ব্যাংকের বিপরিতে ব্যাডমিন্টন মাঠে শাবাব ও মাহির বন্ধুদের অবগত করে।
জুনেদ নামের এক পথচারি ও শাবাব-মাহির বন্ধুরা গুরুত্বর আহত শাবাব ও মাহিকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে পৌঁছালে কর্তব্যরত ডাক্তার অতিরিক্ত রক্তক্ষরনে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন। মামলায় প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী রাখা হয়েছে অর্ক, বিপ্লব, পল্লব, সোহান ও সহিদ আহমদ জুনেদকে। এবিষয়ে নিহত শাহবাবের মা সেলিনা রাহমান চৌধুরী বলেন, পরিকল্পনা করেই তুষার গ্রুপের সদস্যরা আমার ছেলে শাবাবকে হত্যা করেছে। আমি হত্যাকারীদের শাস্তি চাই। আমরা ছেলের দেশের নোংরা ও প্রতিহিং¯্রা রাজনীতির কাছে বলি হয়েছে।
পুলিশ এ ঘটনায় মামলার এজহারভুক্ত ৩ জনকে গ্রেফতার করলেও হত্যার প্রধান আসামী ও মূল পরিকল্পনাকারীরা এখনো রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাহিরে। গ্রেফতারকৃতরা হল রুবেল, কনক ও জামিল। ইতিমধ্যে এই ৩জনের ২ দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। অনান্য আসামীদের আটক করতে অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানায় পুলিশ।



মন্তব্য করুন