৭১ এর মুক্তিযোদ্ধার গল্প এখনো অপেক্ষায় আছি প্রধানমন্ত্রীর ডাকের

December 17, 2017,

ইমাদ উদ দীন॥ সে বীর প্রতীক খেতাব পেলেও আমার কপালে তা জুটেনি। ওর এমন খেতাবে আমি গর্বিত। সেই ১৯৯৬ সাল থেকে অপেক্ষা করছি। এখনো অপেক্ষায় প্রহরগুনি। প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের ইচ্ছা পোষন করে একাধিক বার ডাক যোগে রেজিস্ট্রি চিঠিও দিয়েছি। সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের লোকজনের হাতেও আবেদন পৌঁছে দিয়েছি। কিন্তু এখনো সাড়া মেলেনি। জীবন সায়হ্নে স্বপ্ন প্রত্যাশায় হতাশ হয়ে কান্নাজড়িত কন্ঠে এমনটিই বলছিলেন ৭১ এর রনাঙ্গনের গর্বিত এক বীর সৈনিক। যিনি দেশ মাতৃকার গর্ব ৭১ রনাঙ্গনের সাহসী নারী সৈনিক দেশের আলোচিত নারী বীর প্রতীক তারামন বিবির ধর্মীয় বাবা ও তারামন কে নারী মুক্তি সৈনিক বানানোর নেপথ্যের কারিগর। রনাঙ্গনের অগ্রগামী সাহসী সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন মুহিবুর রহমান (মহিব)। তিনি ছিলেন তারামনদের ক্যাম্পর কমান্ডার ও ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাবিলদার। জীবনের পড়ন্ত সময়ে এখনো তাকে ওই দিনের নানা স্মৃতি আলোড়িত করে। ৭ই মার্চ জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর সে ভাষণ আজও কানে বাজে। যে ডাক তাকে উজ্জ্বীবিত করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার। দেশ স্বাধীনের স্বপ্ন প্রত্যাশায় তাকে চাকুরী আর স্বজনদের মায়া ছেড়ে যুদ্ধে যেতে অনুপ্রাণিত করে। নানা বিপদ সংকুল পরিবেশেও জীবনের ঝুঁকিতে ভীত না হয়ে হাল ধরেন। আর প্রাণ প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রু মুক্ত করেন। রনাঙ্গনের হার নামানা লড়াকু সে সাহসী সৈনিক মান অভিমানে আজ অনেকটাই নিরব নিস্তেজ। চাপা ক্ষোভ আর বেদনায় হতাশ। জীবনের শেষ সময়ে প্রত্যাশা জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা দেশের মাননীয় প্রধামন্ত্রীর সাথে একবার সাক্ষাতের। গতকাল দুপুরে মৌলভীবাজার শহরের সুলতান পুরের বাসাতে কথা হয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধার সাথে। যুদ্ধের নানা স্মৃতি রোমান্থর করেন এক নাগাড়ে। আর মাঝে মধ্যে ওই দু:সমেয়র স্মৃতি স্মরনে যেন আন মনে হারিয়ে যান ওই সকল ঘটনার প্রবাহে। তিনি বলেন তখন আমি সেনাবাহিনীতে চাকুরি করতাম। ১৯৭১ সালে মার্চ মাসে আমি ছুটি চাই। কারন বাড়িতে আসতে আমার মন ছটফট করছিল। কিন্তু কিছুতেই মিলছিলনা ছুটি। অবশেষে আমার এক সিনিয়র অফিসারকে বললাম স্যার ছুটি না দিলে চাকুরি ছেড়ে দেব। পরে উনি নানা ভাবে ম্যানেজ করে আমার ছুটির ব্যবস্থা করেন। মিলে ১০ দিনের ছুটি। বাড়িতে আসার ৩ দিন পর আমার বাবা মারা যান। ৪ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে আমি ছিলাম ৩য়। আমাদের গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আগিউন মোল্লা বাড়ি। বাবার মৃত্যুর খবরে বাড়ি আতœীয় স্বজন আর পাড়া প্রতিবেশীদের ভীড় ছিল। বাবাকে কবরে শায়িত করার কয়েক দিনের মাথায় ডাক পড়ে মুক্তি যুদ্ধের। আমার ছুটি শেষ হওয়ায় বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাই। যাবার সময় আমাকে সর্তক করেন। যুদ্ধে যেতে বারন করেন। কিন্তু আমি তখনই সিন্ধান্ত নিয়ে নেই যুদ্ধে আমি যাবই। এরপর ট্রেনযুগে আমার কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। রংপুর পৌঁছার পর ট্রেন বিরতি দেয়।

আমি তখন রংপুর ক্যান্টরমেন্টে হাজিরা দেই। আর রাত্রি যাপন করি। ওখানে পরিচিত কয়েকজন সিনিয়র আমাকে আদর করে ধমকান কেন এখন চাকুরিতে যোগ দিতে আসলাম। ওই রাতেই অনেকটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব ছিল। রাত পোহালে আমাদের রেশনের গাড়ি ওখানে আসলে চলে যাই সৈয়দপুর ক্যান্টরমেন্টে। ওখানে আসার দু’একদিন পর পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর আক্রমণ। হঠাৎ ওদের আক্রমনে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। তাদের এমন আক্রমনে আমাদের অনেক সদস্য মারা যান। ২৯-৩০ মার্চের দিকে মেজর নিজাম,ক্যাপ্টেন আশরাফ, ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও আমি ভারতের আসামের কামার পাড়ায় চলে আসি। ওখানে আমরা বাংলাদেশ থেকে আসা প্রায় ৩০জন কে অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং দেই। একদিন ওখানে স্বজনদের সন্ধানে কুড়িগ্রাম এলাকার এক লোক আসে। আমরা তার মাধ্যমে ওখানকার খবর পাই। তখন আমরা সিন্ধান্ত নেই যে যুদ্ধ করতে কুড়িগ্রামেই যাব। আমরা ৩০ -৩৫ জনের দল কুড়িগ্রামের কর্তৃমারি পৌঁছাই। ওখানে পৌঁছে গ্রাম বাসি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে বলি আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আমাদেরকে খাবার দিয়ে সহযোগীতা করার। এরপর রাজীবপুরে আজিজ মাস্টারের বাড়ির নদীর পাশে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প গড়ে তুলি। ওখানে রান্না বান্নার জন্য খুব সমস্যা হত। একদিন আজিজ মাস্টারকে বলি রান্নার জন্য একজন লোক দিতে। তখন বীরপ্রতীক খেতাব প্রাপ্ত তারামন কচুরলতি তুলছিল। তার বয়স তখন ১৪ কি ১৫ বছর। মাস্টার সাহেব তাকে জিজ্ঞেস করলেন আমাদের রান্না করে দিতে পারবে কিনা। তারামন জানাল তার মা বললে পারবে। আমি তখন তার মায়ের কাছে যাই। মাস্টার বাড়িতে পিতৃহীন তারমনের মা ও দুই ভাই দুই বোন আশ্রিত ছিল। মা অন্যের বাড়িতে কাজ কিংবা ভিক্ষা করেই চালাতেন সংসার। তার মাকে তারামনের কথা বলতে তিনি বললেন ওখানে দিলে তো আর বিয়ে হবে না। ওখানে সে কিভাবে কাজ করবে। সে তো মে মানুষ। তখন আমি বললাম আজ থেকে আমি ওর ধর্মের বাবা। কোন সমস্যা নেই। ওর দেখভালের দ্বায়িত্ব আমি নিলাম। এরপর তার মা তাকে আমার হাতে তুলে দেন। ওখানে আলাদা একটি ঘরে সে থাকত। আর আমাদের ক্যাম্পের সবার রান্নাবাড়ার কাজ সামাল দিত। একদিন কাজের অবসরে তারামনকে বললাম যুদ্ধ করবে নাকি। সে আগ্রহী হয়ে বলে বাবা আমি দেশের জন্য যুদ্ধ করতে চাই। তার এমন আগ্রহে আমি অনুপ্রাণিত হই। তাকে ট্রেনিং দেই। সে রাইফেল,এসএমজি,এলএমজি ও হ্যান্ডগ্রেনেড চালাতে পারদর্শী হয়ে উঠে। একসাথে রান্না ও যুদ্ধ করে আর ভিক্ষাবৃত্তির অভিনয়ের মাধ্যমে গোয়েন্দার কাজও করে। মনে পড়ে একদিন প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে আমি ফজরের নামাজ পড়ে ফেরার পথে দেখি পাকিস্থানী সৈন্যরা দূর থেকে আমাদের রেকি করছে। এমন দৃশ্য দেখে আমি বুঝে ফেলি তারা আমাদের উপর আক্রমণ করবে। এরপর গ্রামের সবাইকে বাড়ি থেকে সরিয়ে নিরাপদ দূরে পাঠাই। এঘটনার দু’দিন পর ওরা আমাদের ঘাঁটিতে হামলা করে। আমরা প্রায় দেড় শতাধীক। আর ওরা প্রায় ৩শতাধীক। আমরা কৌশলে নদীর তীরে বাংকার বানাই। তাদের আসার পথে সারিবদ্ধ হামলা চালাই। এতে ওদের প্রায় ৬০-৭০ জন সৈন্য মারা যায়। আর আমাদের ২জন শহীদ হন ও কয়েকজন আহত হন। এরপর পাকিস্থানী সৈন্যরা ওখান থেকে পালিয়ে যায়। এরপর রাজীবপুর কুদালঘাটি,তারাপর,তারাবর,যাদুরচর,গাইবান্ধাসহ অনেক স্থানেই শত্রু মুক্ত করতে যুদ্ধ করেন তিনি ও তার সহযোদ্ধারা। দেশ স্বাধীন হলে তিনি নীড়ের টানে ফিরে আসেন নিজ বাড়িতে। ১৯৯৪ সালে হাবিলদার মহিব অনারারি ক্যাপ্টেন হিসেবে সেনাবাহীনি থেকে অবসর নেন। সেনাবাহিনীতে কৃতিত্বের জন্য পেয়েছেন অনেক পদক। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পাননি খেতাব। একটি লোভাতুর ঘটনার প্রতিবাদে গ্রহন করেননি মুক্তিযোদ্ধের বিশেষ কোন খেতাব। তার কাছ থেকে ট্রেনিং প্রাপ্ত কিংবা একই সেক্টরের যুদ্ধারা খেতাব পেলেও ¯্রফে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়ে বেঁচে আছেন তিনি। ১৯৯৫ সালে খোঁজ মিলে রনাঙ্গনের বীর নারী সৈনিক তারামনের। দেখানো হয় টেলিভিশনে। দীর্ঘদিন পর ১৯৯৬ সালে ঘটনাচক্রে তার দেখা হয় তারামনের সাথে। তখন তিনি তারামনকে নিয়ে ঢাকা হয়ে যান যুদ্ধের স্মৃতিময় রংপুরে। সে সময় রংপুর জেলা প্রশাসক বলেন প্রধানমন্ত্রী তাদের সাথে দেখা করতে চান। কাল ঢাকায় যেতে হবে। এরপর জানানো হয় না এখন নয় পরে জানানো হবে। এতদিন পরও আর প্রধান মন্ত্রীর ডাক পাননি মহিব। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ৩ ছেলে ও মেয়ের বাবা। জীবন সংগ্রামে পিছনে পড়ে থাকা এই মাঠ যোদ্ধা জীবন সায়হ্নে এখন বড্ড অসহায়।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com