৪ বছর পর জেলার আলোচিত অবনী বাকতি হত্যার রহস্য উদঘাটন পরকীয়ার কারনেই পরিকল্পিত ভাবে হত্যা

স্টাফ রিপোর্টার॥ ৪ বছর পর জেলার আলোচিত চা শ্রমিক অবনী বাকতি হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পিবিআই পুলিশ। তদন্তে পরকীয়ার কারনে অবনী বাকতি হত্যাকান্ডের বিষয় নিশ্চিত হয়েছে পিবিআই।
৫ মার্র্চ সোমবার দুপুরে মৌলভীবাজার জেলা পিবিআই পুলিশ কার্যালয়ে প্রেস বিফিংয়ে লিখিত বক্তব্যে এই মামলার আদ্যোপ্রান্ত ও হত্যাকান্ডের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। প্রেস বিফিংয়ে এবিষয়টি তুলে ধরেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর মৌলভীবাজার কার্যালয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ শাহাদাত হোসেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মুহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম, পুলিশ পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম সহ অনান্যরা। জানা যায় একাধীক তদন্তের পরও মামলার রহস্য উদঘাটন না হওয়ায় বিজ্ঞ আদালতের নিদের্শে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআই পুলিশকে দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়। পিবিআই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পুলিশ পরিদর্শক, সুমন কুমার চৌধুরী গত ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে মামলাটির তদন্ত শুরু করেন। তিনি মামলাটি তদন্ত করাকালীন জানতে পারেন অবনী বাকতি (লব) তার প্রতিবেশী জেলার কমলগঞ্জ থানার ফুলবাড়ি চা বাগানের ৭ নং লাইনের বাসিন্দা মৃত অনন্ত বাকতির পুত্র রদিপ বাকতি (২৬), মৃত রতি তন্তবাইর পুত্র দেবাশীষ তন্তবাই (২৭), সীতারাম, পিতা-অজ্ঞাত এদের সাথে সে ঘনিষ্ট ভাবে চলাফেরা করত। তারা সকলেই একই স্থানে মদ্য পানও করত। অবনী বাকতি তাদের সাথে চলাফেরার কারনে সে তার প্রতিবেশী ও বন্ধু রদিপ বাকতি এর বাড়িতে যাওয়া আসা ছিল। অবনী বাকতি রদিপ বাকতির বাড়িতে আসা যাওয়ার কারনে তার কাকী এর সহিত প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। এই মামলার ঘটনার অনুমান ১ মাস পূর্বে এই সম্পর্কের বিষয়টি রদিপ বাকতি জানতে পারে। এরপর থেকে অবনী বাকতির সাথে রদিপ বাকতির সম্পর্কের দুরত্ব ও মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। এই মনোমালিন্যতার জের ধরে রদিপ বাকতি তার অপর দুই বন্ধুর সহযোগীতায় অবনী কে হত্যার পরিকল্পনা করে বলে তিনি অবগত হন। ২৬ শে জানুয়ারি ২০১৮ পুলিশ পরিদর্শক সুমন কুমার চৌধুরী ইউএন মিশনের জন্য মনোনিত হইলে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মোঃ শিবিরুল ইসলাম, পুলিশ পরিদর্শক মামলাটির তদন্তের দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি গ্রহন করার পর এই হত্যাকান্ডের একই কারন খুঁজে পান। প্রাপ্ত তথ্যের যাচাই বাচাই শেষে গত ২৮ শে ফেব্রুয়ারি অবনী বাকতি হত্যায় মুল সন্দেহভাজন আসামী রদিপ বাকতি (২৭) কে গ্রেফতার করা হয়। সে অবনী বাকতি হত্যার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বিজ্ঞ আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। জানা যায়, অবনী বাকতি ছিল তার পিতা মাতার একমাত্র সন্তান। তার কোন নিকট আত্মীয় ছিল না। এই মামলার বাদীর স্ত্রী অবনী বাকতির দুঃসম্পর্কের পিসাতো বোন ছিল। অবনী বাকতি চুনারুঘাট থানাধীন দেউন্দি চা বাগানের পিতা-প্রসেন বাকতিরে মেয়ে জননী বাকতিকে বিয়ে করেছিল। পরষ্পরের সহিত বনিবনা না হওয়ায় মাত্র ৩-৪ মাস সংসার করার পর তাদের দাম্পত্য জীবনের বিচ্ছেদ ঘটে। অবনী বাকতি নিঃসন্তান ছিল। বিচ্ছেদ হওয়ার পর থেকে ঘটনার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ১ বছর অবনী বাকতি তার ঘরে একাকী বসবাস করত। তার সাথে শীতারাম, দেবাশীষ ও রদিপ বাকতি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। তারা প্রায়ই একসাথে ঘনিষ্টভাবে চলাফেরা করত। অবনী বাকতি প্রায়ই রদিপ বাকতির বাড়িতে আসা যাওয়া করত। রদিপ বাকতির চাচা অসুস্থ থাকায় ও অবনী বাকতি ওই বাড়িতে যাওয়া আসায় তার কাকীমার সাথে অবনী বাকতি প্রথমে প্রেম পরবর্তীতে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। আসামী রদিপ বাকতি ওই সম্পর্কের বিষয়টি শুনে শীতারাম ও দেবাশীষকে জানায়। শীতারাম প্রথমে অবনী বাকতিকে এই সম্পর্কের কথা জানতে পেরে তা ছিন্ন করে সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করে। এই ঘটনার প্রায় মাস খানিক পর ৩ জানুয়ারি ২০১৪ সালে রদিপ বাকতি ও শীতারাম ওই দিন দুপুর ১২ টার দিকে ফুলবাড়ি চা বাগানে বাঁশ কাটতে গেলে দেখতে পায় অবনী বাকতি ও তার কাকী অনৈতিক কাজে লিপ্ত। তখন তারা দুজনে মিলে অবনী বাকতিকে এই অনৈতিক কাজে বাধা দিলে সে ওদেরকে গালিগালাজ করে। একই সাথে তাদের হুমুকিও দেয়। ওই দিন সন্ধ্যার দিকে রদিপ বাকতি, দেবাশীষ দেব ও শীতারাম অবনী বাকতির বাড়িতে যায় এবং এ বিষয়ে পুনরায় ভিকটিমকে সতর্ক করলে সে তাদের সাথে দূর্ব্যবহার করে। তার দূর্ব্যবহারের কারনে উপরোক্ত আসামীগন তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এরই ধারাবাহিকতায় ঘটনার দিন রাত অনুমানিক ৯টার দিকে পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক শীতারাম (২৮) তার সাথে বল্লম (পিকল) নিয়ে রদিপ বাকতি (২৭) ও দেবাশীষ (দেব) কে সাথে নিয়ে পূনরায় অবনী বাকতি বাড়িতে গিয়ে তার সাথে এ বিষয়ে কথা বলে। রাত ১০ টার দিকে তারা সুকৌশলে ফুলবাড়ি চা বাগানের ১০ নং সেকশনে মন কুচি কুচি এলাকায় রাস্তার পাশে নিয়ে আসে। মন কুচি এলাকায় আসার পর তারা বিষয় অবনী বাকতির সাথে পুনরায় তর্কে লিপ্ত হয়। তর্কের এক পর্যায়ে আসামীগন ভিকটিমকে মারধর করে। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তি হয়। ধস্তাধস্তিতে অবনী মাটিতে পড়ে গেলে দেবাশীষ দেব ও রদিপ বাকতি তার উপরে হাটু গেড়ে বসে এবং শীতারাম অবনী বাকতির মাথায় পিকল দিয়ে আঘাত করলে মাথার এক পাশ হতে অন্য পাশ দিয়ে ছিদ্র হয়ে যায়। অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের কারনেই ঘটনাস্থলেই অবনী বাকতি মারা যায়। এই হত্যার সাথে জড়িত একজন আটক রয়েছে। পলাতক অন্য দুই আসামী শীতারাম (২৮), দেবাশীষ দেবকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানায় পিবিআই পুলিশ।



মন্তব্য করুন