নাসিরপুর ও বড়হাট জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের এক বছর  চকচকে বাড়ি দু’টিতে নেই সেই ক্ষতচিহ্ন

April 7, 2018,

ইমাদ উদ দীন॥ দু’টি জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের একবছর। তাই জেলা জুড়ে ঘুরে ফিরে আলোচনায় অপারেশন ‘ম্যাক্সিমাস’ ও ‘হিট ব্যাক’। কৌতুহল নিবারনে অনেকই ওই বাড়ি দু’টি দেখতে আসছেন। আর এমন জঙ্গি কর্মকান্ডের নিন্দা ও  ঘৃণা জানাচ্ছেন। সরজমিনে বাড়ি দু’টিতে গেলে এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে। দু’টি জঙ্গি আস্তানার বড় ধকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সফল ভাবে সামাল দিলেও। ওই ভয়ার্ত অভিযানের দু:স্ব স্মৃতি এখনো ভুলতে পারেনি জেলাবাসি। তবে অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত দু’ বাড়িতেই এখন নেই সেই ক্ষতচিহ্ন। নাসিরপুরের বাড়িটি মেরামতের পর ফিরেছে আগের রুপে। আর বড় হাটের বাড়িটিতে চলছে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ। জানা গেল বাড়ি দু’টি মেরামত আর সুন্দর্য বর্ধন করে বাড়ির মালিক ভুলতে চান কলঙ্কময় ওই দু:স্ব স্মৃতি। জেলার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের নাসিরপুর আর পৌর শহরের বড়হাট। ওই এলাকার বাসিন্দারা জঙ্গি আস্তানায় অভিজানের কথা স্মরণে এখনো আৎকে উঠেন।

২০১৭ সালের মার্চের শেষের দিকে শান্তিপ্রিয় নাসিরপুর গ্রাম আর মৌলভীবাজার শহরের বড়হাট এলাকার বাসিন্দাসহ পুরো জেলাবাসি হঠাৎ জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের খবরে আতঙ্কিত হন। অজানা শঙ্কায় প্রবাসী অধ্যুষিত শান্ত এজেলার দেশ ও প্রবাসের বাসিন্দারা উদ্বেগ উৎকন্ঠায় কাটান রাত দিন। কাউন্টার টেররিজম ইউনিট,সোয়াত,র‌্যাব ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চালান রুদ্ধশাস অভিযান। ৮২ ঘন্টার ওই অভিযানে কোন বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই সফল সমাপ্তি ঘটে। আস্তানা দু’টিতে অভিযান শেষ হলে দীর্ঘ সময় উদ্বেগ উৎকন্ঠার পর স্বস্তিতে ফিরেন জেলাবাসী। অভিযান শেষে দুই জঙ্গি আস্তানায় মিলে ১০ টি মরদেহ। নাসিরপুরে অপারেশন হিটব্যাক এর পর জঙ্গি আস্তানার ওই বাড়িতে মিলে সাত জনের ছিন্ন ভিন্ন দেহ। ওখানে ছিল ১ থেকে ১২ বছর বয়সের ৪টি শিশু, ২ জন মহিলা যাদের বয়স (১৮,৩৫) ও ১জন পুরুষ (৩৮) বছর বয়স বলে ধারণা করা হয়। আর মৌলভীবাজার শহরের বড়হাটের অপারেশন ম্যাক্সিমাস’ এ নিহতের সংখ্যা ছিল ৩ জন। এরমধ্যে  ২জন পুরুষ ও একজন মহিলা। অপারেশন “হিট ব্যাক” ও ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’ নিয়ে টানা তিন দিন নানা কৌতুহল আর উদ্বেগ উৎকন্ঠায় উদ্বিগ্ন ছিলেন প্রবাসী অধ্যুষিত শান্তি প্রিয় এ জেলার মানুষ। আর দেশবাসীর কৌতুহলী প্রতিক্ষার সাথে এ জেলার প্রবাসীদেরও উৎকন্ঠার শেষ ছিলনা। বন্ধীদশায় ছিলেন জঙ্গি আস্তানা এলাকার বাসিন্ধারাও। পুলিশি নিরাপত্তার কারনে জেলা সদরের সাথে যোগাযোগ ব্যাবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল অনান্য উপজেলার। নিরাপত্তা জনিত বাড়তি সতর্কতার কারনেই ছিল এমন দূর্ভোগ। অভিযানের কারণে ১৪৪ ধারা বলবৎ থাকায় ওই এলাকার ব্যবসায়ীসহ স্থানীয় বাসিন্ধাদের ভোগান্তির অন্ত ছিলনা। জানা যায় সিলেটের আতীয়ার মহল ও চট্রগ্রামের সিতাকুন্ডের জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের পর প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মৌলভীবাজার শহরের বড়হাট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রাথমিক অভিযানে নিশ্চিত হন জঙ্গি আস্তানার। প্রথমে বড়হাটের ওই বাড়িটি জঙ্গি আস্তানা হিসেবে চিহ্নিত হলেও ওখানে অভিযানে পর তথ্য মিলে একই মালিকের গ্রামের বাড়িতেও ভাড়া নিয়ে আস্তানা গড়ছে জঙ্গিরা। উভয় বাড়ির মালিক নাসিরপুরের মৃত আছদ্দর লন্ডনীর ছেলে লন্ডন প্রবাসী সাইফুর রহমান। পৌর শহরের বড়হাটের ওই বাড়ি থেকে নাসিরপুরের গ্রামের বাড়ির দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। ২৮ মার্চ বিকেলে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও সোয়াত জঙ্গি আস্তানা দু’টিতে পৌঁছার পর রেকি করে। এরপর তারা নাসিরপুরের বাড়িতে অভিযান শুরু করে।

এ সময় নাসিরপুরের ওই বাড়ি থেকে ২-৩ কিলোমিটার দূরে বিভিন্ন স্থানে ওই গ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলির উৎসুক জনতার উপচে পড়া ভীড় ছিল লক্ষ্যণীয়। নিরাপদ দূরে থেকে উদ্বেগ উৎকন্ঠায় তারা অভিযান প্রত্যক্ষ করছিলেন। তাদের এলাকা জঙ্গি কলঙ্ক গোছাতে অনেকেই নানা ভাবে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীকে সহায়তাও করেছেন। নাসিরপুরের ওই আস্তানাটিকে জঙ্গিরা নিজেদের ‘হাইডআউট’ হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলো। গ্রামীণ জঙ্গি আস্তানার মধ্যে সিলেট বিভাগেই এটিই ছিল প্রথম। এমন তথ্য কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের। তবে বাড়ির মালিক যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাইফুর রহমান জঙ্গি বিরোধী শক্ত অবস্থানের কারনে কেয়ারটেকারের মাধ্যমেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নানা তথ্য দিয়ে সহযোগীতা করেন।

মুঠোফোনে বাড়ির মালিক যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাইফুর রহমান জানান ওই জঙ্গিরা তাদের পরিচয় গোপন রেখে কেয়ারটেকারের সাথে কথা বলে বাড়ি দু’টি ভাড়া নেয়। ধর্ম ও মানবতার শত্রু ওই জঙ্গিরা আমাদের অজান্তে তাদের আস্তানা গড়ায় আমার পরিশ্রমের উর্পাজনে তৈরী শখের বাড়ি দু’টি শেষ করে দিয়েছে। আবার নতুন করে গড়তে হয়েছে। তিনি বলেন আমি সবসময় দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করতে আগ্রহী।

আমার এলাকায় সমাজ সেবামূলক অনেক কাজই এর দৃষ্ঠান্ত। কিন্তু ওদের এমন কর্মকান্ড আমাকে বিব্রত করেছে। তিনি জঙ্গি কলঙ্ক মুক্ত করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদও জানান। সুত্রে জানা যায় বড়হাটে নিহত নারী জঙ্গির পরিচয় গেল ১ বছরেও বের করতে পারেনি পুলিশ। তবে পুলিশ বলছে ওই নারীর পরিচয় উদ্ধারে তাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। জানা যায়, ২০১৭ সালের ১ এপ্রিল বড়হাটে অপারেশন ম্যাক্সিমাস সমাপ্ত হওয়ার পর নিহত ২ পুরুষ ও ১ নারী জঙ্গির মধ্যে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার দেউটি ইউনিয়নের আশরাফুল আলম নাজিম নামের একজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া গেলেও বাকী ২জনের পরিচয় পায়নি পুলিশ।

কয়েক মাস পরে ময়মনসিংহের, ফুলবাড়িয়া-ঝুরবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেনের ছেলে শাখাওয়াত হোসেন প্রকাশ মাহফুজ নামে নিহত আরেক জঙ্গির পরিচয় পায় পুলিশ। পুলিশ জানায় জঙ্গি মাহফুজ এক সময় নৌবাহিনীত কাজ করত। পরবর্তীতে সে জঙ্গি কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত বড়হাটের সেই নারী জঙ্গির পরিচয় বের করতে ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ। আর ৩০ মার্চ নাসিরপুরে অপারেশন হিটব্যাকে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের স্বামী-স্ত্রী ও ছেলে সন্তান সহ ৭জন নিহত হন। তাৎক্ষণিক ভাবে তাদের পরিচয়ও পাওয়া যায়। কিন্তু স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে ওই বাড়িতে মধ্য বয়সী আরেকজন পুরুষ থাকত। অভিযানের সময় সে ওখানে ছিলনা। তার কোন তথ্য এখনো জানতে পারেনি আইশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তাকে ধরতে পারলে হয়ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেত বলে স্থানীয়দের ধারনা।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com