বন্যায় নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে  হাওর অঞ্চল

June 21, 2018,

ইমাদ উদ দীন॥ নদী তীরবর্তী এলাকার বন্যা পরিস্থিতি এখন অনেকটা উন্নতির দিকে। কিন্তু নতুন করে বন্যার দূর্ভোগে পড়েছেন হাওর পাড়ের মানুষ। গেল ২-৩ দিন থেকে উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাত না থাকায় কমছে বানের পানি। বন্যা কবলিত গ্রাম ও শহরের বসত ভিটা ও রাস্তাঘাট থেকে নামতে শুরু করেছে পানি। তবে জেলার নদী তীরবর্তী এলাকার বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হলেও বন্যা কবলিত হচ্ছে জেলার হাওর অঞ্চল।

মনু ও ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙ্গে তীরবর্তী এলাকা বন্যা প্লাবিত হওয়ার পর। এবার নতুন করে বন্যা আক্রান্ত হচ্ছেন জেলার হাওর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা। মনু,ধলাই ও কুশিয়ারা নদীর পানি (অপেক্ষাকৃত উচুঁ এলাকা থেকে নীচু এলাকা) হাওরে গিয়ে পড়ায় এখন হাওর এলাকায় বন্যার ঘনঘটা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান মঙ্গলবার বিকেল থেকেই জেলার হাকালুকি ও কাউয়াদিঘি হাওরের পানি বাড়তে শুরু করেছে। এর আগে পানি অল্প করে বাড়লেও এখন তা দ্রুত বাড়ছে। মনু,ধলাই ও কুশিয়ারা নদীর পানি উজান বেয়ে হাওরে পড়ায় উপছে পড়া পানিতে হাওর এলাকায় নতুন করে বন্যা দেখা দিচ্ছে।

তাছাড়া মঙ্গলবার কুশিয়ারা নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে কাউয়াদিঘি হাওর এলাকার ১০-১৫টি গ্রামে হঠাৎ করে বানের পানি প্রবেশ করায় সৃষ্টি হয় আকস্মিক বন্যা। হঠাৎ করে এই দুটি হাওরে বানের পানি অস্বাভিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে প্লাবিত হচ্ছে তীরবর্তী গ্রাম। বন্যার পানি উঠতে শুরু করেছে হাওর পাড়ের গ্রামের বাসিন্দাদের বসত বাড়ি ও চলাচলের রাস্তায়। ইতিমধ্যেই বসতভিটায় পানি উঠেছে হাওরের অতি সন্নিকটের অনেক গ্রামেই। বানের পানিতে তলিয়ে গেছে তাদের বসতঘর ও ক্ষেতকৃষি। ডুবতে শুরু করেছে হাওর অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত উঁচু অঞ্চলও। পানি বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে তাদের দূর্ভোগও। হাওর এলাকায় নতুন করে বন্যা দেখা দেওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ উৎকন্ঠার শেষ নেই। গতকাল সরজমিনে হাকালুকি হাওর এলাকায় গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান সোনাই নদী, জুড়ী নদী,কন্ঠিনালা ও ফানাই নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

কয়েকদিন থেকে ওই নদীগুলোতে পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এসকল নদীর উজান হচ্ছে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা। এসব নদী বেয়ে পানি হাকালুকিতেই আসে। আর সুরমা ও কুশিয়ারা নদী দিয়ে বের হয়। সুরমা ও কুশিয়ারা নদী যখন হাকালুকির অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে না পারে তখনই হাওর তীরবর্তী গ্রাম গুলো প্লাবিত হয়। গেল কয়েকদিন থেকে বাড়ছে হাকালুকি হাওরের পানি। গেল ৩দিন থেকে হাকালুকি হাওর পাড়ের দাসের বাজার ভায়া আজিমগঞ্জ ও বাছিরপুর এরজিইডির রাস্তার কয়েকটি স্থানে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। জুড়ী উপজেলার সামন ও জুড়ী চৌমুহনার সড়ক ও জনপথের পাকা রাস্তায়ও পানি উঠেছে। এছাড়া হাওর পাড়ের কয়েকটি সড়কেও পানি উঠেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা বলেছেন আর ২-৩ফুট পানি বৃদ্ধি পেলে হাওর পাড়ের বসত বাড়ির সাথে অনেক গুলো সড়কই পানিতে নিমজ্জিত হবে। হাকালুকি হাওর পাড়ের ভূকশিমইল ইউনিয়নের বাসিন্দা কয়েছ আহমদ বটলাই,আহমদ আলী,আকুল মিয়া,নজমুল মিয়া,গুলজার মিয়া,ছয়ফর মিয়া সহ অনেকেই জানান গেল কয়েক দিন থেকে আমরা বন্যার ভয়ে আছি। হাওরে পানি দ্রুত বাড়ছে।

তারা জানান হাওর তীরবর্তী সাদিপুর, কুরবানপুর,মিরশংকরপুর,গৌরিশংকরপুর ও মহিশঘরী এলাকায় বানের পানি বসতবাড়িতে উঠেছে। ডুবিয়ে দিয়েছে ক্ষেত কৃষিও। মদনগৌরী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো: আব্দুল কাদির বলেন গত বছরের মত এবারো আমাদের স্কুলটি বানের পানি ডুবিয়ে দিয়েছে। আমাদের স্কুলের মত হাওর পাড়ের অনেক স্কুলই এখন বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা স্থানীয়দের। হাকালুকি হাওর পাড়ের কুলাউড়া,জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলা অংশের ২৫-৩০ টি গ্রাম এখন বন্যায় আক্রান্ত। একই অবস্থা কাউয়াদিঘি হাওরেরও। হাওর তীরবর্তী মৌলভীবাজার ও রাজনগর উপজেলার ৩৫-৪০টি গ্রাম বানের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। হাকালুকির কুলাউড়া অংশে ভূকশিমইল,কাদিপুর,জয়চন্ডি,ভাটেরা,বরমচাল ও ব্রাহ্মণ বাজার ইউনিয়ন। জুড়ীর পশ্চিম জুড়ী ও জায়ফরনগর ইউনিয়ন। বড়লেখার সুজানগর,বর্ণি ও তালিমপুর ইউনিয়ন।

আর কাউয়াদিঘি হাওরের তীরবর্তী রাজনগরের উত্তরভাগ,ফতেহপুর,মুন্সিবাজার ইউনিয়ন ও মৌলভীবাজার সদরের মনুমুখ, আখাইলকুড়া ও খলিলপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম বন্যা কবলিত হয়েছে এবং অনান্য গ্রাম গুলিও চরম বন্যা ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এলাকাবাসী জানিয়েছেন প্রতি মুর্হুতেই বাড়ছে পানি। আর নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে তীরবর্তী এলাকা। তারা আশঙ্কা করছেন যে ভাবে পানি দ্রুত বাড়ছে তাতে গেল বছরের মত বন্যা স্থায়ী জলাবদ্ধতায় রুপ নিতে পারে। হাওর পাড়ের বাসিন্দারা জানিয়েছেন মঙ্গলবার বিকেল থেকেই তাদের বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাটে বন্যার পানি উঠতে শুরু করেছে। উজানের পানি ও ভারী বৃষ্টিপাত বন্ধ না হলে তলিয়ে যাবে তাদের ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট। এনিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় ভোগছেন। কারন গেল বছর চৈত্রমাসেই আকস্মিক বন্যায় সব হারিয়েছিল এ জেলার হাওর অঞ্চলের বাসিন্দারা। বসত ভিটা,বোরো ফসল, মাছ, হাঁস, গবাদিপশুসহ হারিয়েছিলেন হাওরের উদ্ভিদ,জলজপ্রাণী ও নানা জীববৈচিত্র্য। সহায় সম্বল হারিয়ে নি:স্ব মানুষগুলো কোন রকম প্রাণে বেঁচেছিলেন। তাই আগাম সর্তকতায় বন্যার আশঙ্কায় হাওর পাড়ের মানুষের এখন রাত দিন কাটছে দুশ্চিন্তায়। জেলার বন্যা দূর্ভোগগ্রস্থ অনেকেই জানান এখন উজান থেকে আসা ঢল আর ভারী বর্ষণ কিছুটা থেমেছে। এ কারনে নতুন করে বাঁধ ভাঙ্গেনি মনু ও ধলাই নদীর। তাই নতুন করে প্লাবিতও হয়নি নদী তীরবর্তী এলাকা। মৌলভীবাজার শহরের ভেঙ্গে যাওয়া মনু নদীর বাঁধ মেরামত করায় হয়েছে। তাই ওই বাঁধ দিয়ে শহরে পানি প্রবেশ না করায় বন্যা পরিস্থিতি অনেকটাই উন্নতি হচ্ছে। দূর্ভোগ কিছুটা হলেও কমতে শুরু করেছে বন্যার্তদের।

তবে নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় চরম উদ্বেগ উৎকন্ঠায় রাত দিন কাটাচ্ছেন জেলার কাউয়াদিঘি ও হাকালুকি হাওর তীরের বাসিন্দারা। কাউয়াদিঘি হাওর তীরবর্তী রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুকুল চন্দ্র দাস বুধবার দুপুরে মানবজমিনকে জানান কুশিয়ারা ও মুনু নদীর পানি কাউয়াদিঘি হাওরে প্রবেশ করায় তার ইউনিয়নের জনগণ বন্যা আতঙ্কে ভোগছেন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি গ্রামও বন্যা আক্রান্ত হয়েছে। গেল বছরের পর এবছরও বন্যা আক্রান্ত হলে কি ভাবে তারা খাবেন বাঁচবেন এই দুশ্চিন্তায় তাদের রাত দিন একাকার।

হাকালুকি হাওর তীরবর্তী কুলাউড়া উপজেলার ভূকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির বুধবার দুপুরে বলেন গেল কয়দিন থেকে হাকালুকি হাওরের পানি বৃদ্ধি পাওয়া দেখে সোমবার আমার ইউনিয়ন পরিষদের সকল সদস্যদের নিয়ে পূর্ব প্রস্তুতিমূলক সভা করেছি। বন্যা কবলিত হলে তাদের দ্রুত উদ্ধার ও যাতে শুকনো খাবার দিয়ে নিরাপদে রাখা যায় এই ব্যবস্থা রেখেছি। তিনি গত বারের মত ভয়াভহ বন্যা ও দীর্ঘ জলবদ্ধতা থেকে রক্ষা পেতে সকলের দোয়া চান।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com