শবে বরাতে সৈয়দ শাহ মোস্তফা (র:) মাজার প্রাঙ্গন এখানে এতো ভিক্ষুক আসে কোথা থেকে ?

ইমাদ উদ দীন॥ শবে বরাতকে উপলক্ষ করে মাজার প্রাঙ্গনে প্রায় ৪ শতাধিক ভিক্ষুকের মৌসুমী হাট। দুপুর থেকে গভীর রাত। ভিক্ষুকদের আবদার আর নিজস্ব ভঙ্গিমায় মুসল্লিদের দৃষ্টি আর্কষণের সুরতালের হাকডাকের ব্যস্ততার কোনো কমতি নেই। আয় রোজগারও হয় ভালো।
৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা (র:) মাজার মৌলভীবাজার শহরের প্রাণ কেন্দ্রেই। মাজারের পাশেই মৌলভীবাজার টাউন কামিল মাদ্রাসা, পৌর টাউন ঈদগাহ ময়দান আর কবরস্থান। পবিত্র শবে বরাতে ওই ওলির মাজার ও কবরস্থান জিয়ারত করতে আসা নতুন আগুন্তুকরা এমন দৃশ্যে রীতিমত ভীমড়ি খাচ্ছেন।
তাদের চোখ হচ্ছে ছানাবড়া। বলছেনও তাই। এর আগে কখনো এতো ভিক্ষুক এক সাথে একইস্থানে জড়ো হওয়ার দৃশ্য দেখননি তারা। এযেন ভিক্ষুকদের হাট। এমন দৃশ্যে সবার কৌতুহল জাগে এখানে এতো ভিক্ষুক জড়ো হয় কি ভাবে। ওরা আসে কোথা থেকে।
বাৎসরিক ওরস ছাড়া মাজার এলাকায় এরকম ভীড় হয় না বললেই চলে। ওরসের সময় ৩ দিন ব্যাপী মাজার এলাকায় মেলা ও শবে বরাতে ভিক্ষুকদের হাট এটাই এখন ঐতিহ্য এমনটি বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের কথার সত্যতাও মিলে। ভিক্ষুক,ভেষজ ওষধের কবিরাজ আর ছোট ছোট খাবার দোকানীদের হাকডাকে সরগরম মাজার এলাকা। দিনটি পবিত্র শবে বরাত।
তাই ওই ওলির মাজার জিয়ারতের সাথে মাজার এলাকার কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আত্মীয়,স্বজন ও পরিচিতজনদের কবর জিয়ারত করতে আসেন বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। বাদ যোহর থেকেই মাজার এলাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসল্লিদের ভীড় বাড়ার দৃশ্য লক্ষণীয়। সময় যত গড়ায় মুসল্লিদের সংখ্যাও তত বাড়তে থাকে।
সেই সাথে মাজারের প্রবেশ দ্বারের দ’ুপাশ আর আঙ্গিনায় লম্বা সারিতে ভীড় জমান ভিক্ষুকরা। যার যার মতো তালা বাটি নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসেন বিশেষ এই দিনে মানুষের দান খয়রাত পাবার আশায়। আগত মুসল্লিরাও দান করেন বিশেষ এই পবিত্র দিনে মনের বাসনা পুরনের আশায়। ভিক্ষুকদের সাথে আলাপে তারা জানালেন প্রতিবছর শবে বরাত এলে তারা বেশি আয়ের আশায় মাজার এলাকায় আসেন। অনেকেই দুপুর থেকে বসেন আর কেউ সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত থাকেন।
রাত দিন মিলে জনপ্রতি আয় হয় ৩-৪ হাজার। যা কোভিড-১৯ এর আগে আয় ছিলো ৫-৬ হাজার টাকা। পরিবারের সদস্যরা একসাথে ওই দিন ভিক্ষায় নামেন। একারণে আয়ও হয় ভালো। তারা জানালেন মাজার এলাকায় ভিক্ষা করতে মাজার পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে তাদেরকে বাধাঁ প্রদান বা অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকলেও যারা এখানে আগে থেকে ভিক্ষা করেন তারা অনেকটা প্রভাব খাটিয়ে তাদেরকে সরিয়ে ভালো স্থানগুলোতে বসেন। তাই ওদের আয়ও অন্যদের চাইতে ভালো। ওখানে আসা ভিক্ষুকদের অধিকাংশই প্রতিবন্ধী। তাই ভিক্ষাবৃত্তিটা তাদের পেশা। এই মাজার প্রাঙ্গনসহ জেলা শহরের চাঁদনীঘাট, কোট পয়েন্ট, চৌমুহনা,ঢাকা বাসট্যান্ডসহ বিভিন্নস্থানে তারা নিয়মিত ভিক্ষা করে থাকেন বলে জানালেন।
আর অনেকেই মৌসুমী ভিক্ষুক। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধগতির দূর্দিনে কর্মহীন থাকায় তারা শবে বরাতকে টার্গেট করে জেলার অন্যান্য উপজেলা ও দেশের অন্যান্য জেলা থেকেও এক দ’ুদিন আগে পরিবারে সদস্যদের নিয়ে ওখানে আসেন। আলাপে জানাগেল ভিক্ষুকদের অধিকাংশই এজেলার স্থানীয় বাসিন্দা নয়। তারা অন্য জেলা থেকে এজেলায় এসে বিভিন্ন গ্রামে ও শহরের কলোনীতে বসবাস করছেন। কারণ ২য় লন্ডন হিসেবে খ্যাত সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলা প্রবাসী ও পর্যটন অধ্যুষিত হওয়ায় অন্যান্য জেলার অনেকেই এখানে ভালো আয় রোজগারের আশায় চলে আসেন।
শহরের চাঁদনীঘাট এলাকার নিয়মিত ভিক্ষুক মানিক মিয়া,মনু মিয়া,সুফিয়া বেগম,দরগাহ এলাকার এলেমান মিয়া,লাভলী বেগম,সিতারা বেগম ও রুপজান বিবিসহ অনেকেই জানান তাদেরকে স্থায়ীভাবে আয় রোজগারের ব্যবস্থা করেদিলে তারা ভিক্ষাকে পেশা হিসেবে নিবেন না। তবে জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের ভিন্নমত। তারা বলছেন ওদেরকে পূর্নবাসনের ব্যবস্থা করলেও ঘুরে ফিরে তারা ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে আসে। কারণ তারা পুঁজিহীন প্রতিদিনই ভিক্ষা করে ৫শ থেকে হাজার টাকা রোজগার করতে পারে।
ওই লোভে তারা পেশা হিসেবেই ভিক্ষাবৃত্তিটা ছাড়তে পারেনা। তবে তাদের পরামর্শ সরকারি তরফে তাদেরকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়ে শক্তভাবে মনিটরিং করা। যাতে কেউ স্থানান্তরিত হয়ে পুনরায় ভিক্ষাবৃত্তিতে না জড়ায়। ভিক্ষাবৃত্তি ধর্মেও যেমন নিরুৎসাহীত করেছে তেমনি এই পেশাটাও দেশ ও সমাজের আত্মমর্যাদার অবনতি ও ক্ষতির অন্যতম কারন।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো: হাবিবুর রহমান মুঠোফোনে মানবজমিনকে জানান ভিক্ষুকদের পূর্নবাসন বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে তাদেরকে এ পেশা থেকে সরিয়ে আত্মকর্মশীল ও আত্মমর্যাদায় নিয়ে যেতে সরকারের সমাজ সেবা অধিদপ্তর কাজ করছে। জেলার প্রতিটি উপজেলায় সমাজ সেবার মাধ্যমে তাদেরকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু সমস্যা ঘুরে ফিরে ওরা এই পেশায় চলে আসে। তাছাড়া জেলার বাহিরের অনেকেই এই জেলায় চলে আসাতে পরিসংখ্যানগত দিক ও পূর্নবাসনেও চরম ব্যঘাত সৃষ্টি হয়। তিনি এবিষয়ে সকলের সম্মিলিত সার্বিক সহযোগিতার প্রত্যাশা করেন



মন্তব্য করুন