মৌলভীবাজার সড়ক দূর্ঘটনা বাড়লেও করণীয় কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি

সাইফুল ইসলাম॥ ২০২১ সালে মৌলভীবাজার জেলায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪২ টি। এসব দুর্ঘটনায় ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও আহত হয়েছেন ৪৬ জন। ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বছরের শেষ দিন পর্যন্ত মৌলভীবাজার জেলায় ৪২ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩ নিহত ও ৪৬ জন আহত হয়েছেন।
২০২২ সালে তাঁর তুলনায় আরও দূর্ঘটনার হার বেশি। জেলার ট্রাফিক পুলিশ ও নিরাপদ সড়ক চাই নিসচা এবং বিভিন্ন পত্রিকার প্রকাশিত সংবাদ থেকে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৩ মার্চ পর্যন্ত মৌলভীবাজার জেলায় সড়ক দূর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫ জনের মৃত্যু ও ২০জন আহত হয়েছেন।
মৌলভীবাজার জেলায় দিন দিন দূর্ঘটনার হার বাড়লেও সড়ক দূর্ঘটনা রোধে করণীয় কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এদিকে মৌলভীবাজার জেলার বিআরটিএ কার্যালয়ে এ পর্যন্ত দূর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের কোন পরিসংখ্যান তাঁদের কাছে নেই। তবে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সকল স্তরের মানুষকে সচেতনতাই করলে একমাত্র সড়ক দূর্ঘটনা কমাতে পারে।
মৌলভীবাজার জেলা বিআরটিএ কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, মৌলভীবাজার বিআরটিএ কার্যালয়ের কার্যক্রম শুরু থেকে এ পর্যন্ত অর্থাৎ ২০২৩ সালে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সবধরণের যানবাহনের সংখ্যা ৬২ হাজার ৭৯৯ টি।
তার মধ্যে মোটরসাইকেল (ছোট) ৬৯৮টি, হেলথ সার্ভিস ৩৭টি, পাবলিক সার্ভিস মিনিবাস ৭০টি, প্রাইভেট সার্ভিস মাইক্রোবাস ৩৭৫টি, ব্যক্তিগত হালকা যানবাহন ৬৬টি, ডুয়েল যানবাহন ৭৫টি, মোটরসাইকেল (বড়) ৪ হাজার ৫১৬টি, মোটরকার মিডিয়াম সাইজ ১৭৬টি, মোটরকার (এক্সটাবড়সাইজ) ১২টি, পাবলিক সার্ভিস মাইক্রোবাস ২৬২টি, প্রাইভেট সার্ভিস মিনিবাস ১টি, প্রাইভেট ট্যাংক লরি ১টি, মোটরসাইকেল মিডিয়াম ২৬ হাজার ৯০৫টি, মোটরকার ছোট ৯৮টি, প্রাইভেট সার্ভিস মিনিবাস ৬টি, হেবি পাবলিক বাহন ১৭৮টি, এগ্রিকালচার যানবাহন ৩০৫টি, পাবলিক ট্রায়াল বাহন ২টি, প্রাইভেট সার্ভিস মাইক্রোবাস ৭৯টি, পাবলিক অটো টেম্পু ১ হাজার ৮৬৯টি, মিডিয়াম পাবলিক সার্ভিস ৮৮৪টি, হেবি বাহন ২৪টি, (নটএবুলেবুল) ৭টি, অটোরিক্সা ৩৫৩টি, মোটর কার বড় ৪২৩টি, পাবলিক সার্ভস মিনিবাস ৪১৩টি, প্রাইভেট সার্ভিস জীপ ও ওয়াগন ২৪১টি, লাইট পাবলিক সার্ভিস (হালকাযান) ৪৫৫টি, মিডিয়াম প্রাইভেট সার্ভিস ২৪টি, ডেলিভারী ভ্যান ৪০টি, প্রাইভেট ট্রেলার ১২৮টি, বেবি ট্রেক্সী তিন সিট ২৩ হাজার ৮৮৯টি, বেবি ট্রেক্সী ২সিট ১০৪টি, টেক্সী সার্ভিস ৬টি, পাবলিক ট্যাংক লরি ৩৬টি, স্পেশাল সার্ভিস বাহন ৩৮টি, প্রাইভেট আটিকিউ লেইট ৩টি। তবে বিআরটিএ তথ্য মতো কাগজে কলমে যে পরিমাণ যানবাহন রয়েছে, বাস্তবে মৌলভীবাজার জেলার চিত্র ভিন্ন।
যে–কারণে সড়ক দুর্ঘটনা :
সড়ক অথবা ব্রিজের পাশে যত্রতত্র পার্কিং এমনকি যেখানে সেখানে এলোমেলো ভাবে যে কোন ধরণের যানবাহন দাঁড়িয়ে রাখা বা পার্কিং করা, রাস্তা-ঘাটের নির্মাণ ক্রটি, সড়কে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং এর অভাব, চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর প্রবণতা, লাইসেন্স ছাড়া চালক নিয়োগ, পথচারীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেও ভারটেকিং করা, বিরতি ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালনা, সড়ক-মহাসড়কের মোটরসাইকেলও তিন চাকার গাড়ি বৃদ্ধি, রাস্তার পাশে হাট-বাজার ও দোকানপাট বসানোকে দুর্ঘটনার কারণ।
এছাড়া জেলা পর্যায়ে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে অতিরিক্ত লোকসংখ্যা, অপর্যাপ্ত রাস্তা, মোটরসাইকেল ও রিকশার আলাদা লেন না থাকা, পথচারীদের নিয়ম না মানার প্রবণতা, জেব্রাক্রসিং, ওভারব্রিজ, আন্ডার পাস ব্যবহার না করে যত্রতত্র পারাপার ও রাস্তা চলাচল ও পারাপারের সময় বা চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো, রেল ক্রসিং ও মহাসড়কে হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসাসহ আরও বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।
সড়ক দূর্ঘটনার আরেকটি অন্যতম কারণ ক্রটিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থা :
আঞ্চলিক মহাসড়ক অথবা মহাসড়ক সহ গ্রাম অঞ্চলের সড়কগুলোতে বাঁক থাকার কারণে সামনের দিক থেকে আসা গাড়ি দেখতে না পেয়ে অনেক চালক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন।
মৌলভীবাজার দূর্ঘটনার কারণ ব্যাখা হিসেবে সচেতন নাগরিক ইসমাইল মাহমুদ ও শাহেদ আহমদ’র মন্তব্য :
বেশি ভাগই চালকরা ওভার টেকিংয়ের কারণে সড়কে দুর্ঘটনায় পতিত হন। এছাড়া মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ মোটরসাইকেলের সংখ্যা বৃদ্ধি। এছাড়া সড়কের শৃঙ্খলার অভাব তো আছেই। সড়ক খাতে আইনি কার্যক্রম বলতে কিছু নাই। দূর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে হলে আগে শৃঙ্খলাও সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
সড়ক দূর্ঘটনা রোধে করণীয় :
সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে, ট্রাফিক আইন, মোটরযান আইন ও সড়ক ব্যবহার বিধিবিধান সম্পর্কে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণের মধ্যে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। একইসঙ্গে টিভি-অনলাইন পোর্টাল, সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সড়ক সচেতনতামূলক বা দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে।
জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশ থেকে হাট-বাজার অপসারণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, রোডসাইন (ট্রাফিক চিহ্ন) স্থাপন করা, জেব্রাক্রসিং দেওয়া, চালকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা, যাত্রীবান্ধব সড়ক পরিবহণ আইন ও বিধিবিধান প্রণয়ন, গাড়ির ফিটনেস ও চালকদের লাইসেন্স দেওয়ার পদ্ধতিগত উন্নয়ন-আধুনিকায়ন, জাতীয় মহাসড়কে কমগতি ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা এবং লাইসেন্স নবায়নের সময় চালকদের জন্য ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করতে হবে। সড়কের বিশৃঙ্খলা বহুপুরনো। ধীরে ধীরে এ গুলোকে নিয়মের মধ্যে আনতে হবে।
দূর্ঘটনা রোধে সচেতনতা ও পরিবারের ভূমিকা থাকা উচিত :
ব্যক্তি সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি। আমরা যখন বাড়িতে সন্তানদের সময় দেই; তখন পারিবারিক আলোচনার একটি বিষয়বস্ত হতে পারে সড়ক দুর্ঘটনা। তাতে শিশুরা ধীরে ধীরে সড়ক দুর্ঘটনা সম্পর্কে সচেতন হবে। অনেক সময় তাড়া থাকায় বাবা তার সন্তানকে মোটরসাইকেলে করে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিয়ে যান।
কিন্তু বাবা হেলমেট ব্যবহার করলেও সন্তানের জন্য হেলমেট রাখেন না। আরও দেখা যায়, বাবা-মা দু’জনই হেলমেট পড়ে আছেন, তাদের মাঝখানে সন্তানকে বসিয়ে রাখেন হেলমেট ছাড়া। এছাড়াও মোটরসাইকেল দু’জনের অধিক বহন করা থেকে বাঞ্চনীয় থাকতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করলে সচেতন হওয়া সম্ভব । এতে আর দূর্ঘটনা কখনই ঘটবে না।
সড়ক দূর্ঘটনা রোধে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা :
পাঠ্যপুস্তক ও সিলেবাসে সড়ক আইনসহ দুর্ঘটনা রোধের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা একান্ত জরুরি। এছাড়া প্রতিটি পরিবারের অভিভাবক তাঁর স্কুল পড়–য়া সন্তানদের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে স্ব স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পেইনে অংশ নেওয়া।
মৌলভীবাজার বিআরটিএ সহকারি পরিচালক মো. ডালিম উদ্দীন বলেন, আমাদের কাছে এ পর্যন্ত সড়ক দূর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের কোন পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করা হয়নি। তিনি বলেন, সড়ক দূর্ঘটনায় রোধ করতে হলে প্রথমতো সড়কের ডিভাইডার করা না হলে দূর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব না। দ্বিতীয়তো পারিবারিকভাবে ছেলে সন্তানদের উদ্বুদ্ধু করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সকল স্তরের মানুষকে সচেতন হতে হবে। নিরাপদ সড়কের জন্য প্রয়োজন সুন্দর রাস্তা, দক্ষ চালক এবং পরিকল্পনা। তাহলে সড়ক দূর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে।
মৌলভীবাজার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালকের একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে। চালকের একার পক্ষে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়। আমাদের দেশে আইন না মানার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা মূলত হয়ে থাকে। তিনি আরও বলেন, সড়কে যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলা এবং যত্রতত্র পারাপার সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
দূর্ঘটনা রোধে তিনি বলেন, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন, ফুট ওভারব্রীজ ও জেব্রা ক্রসিংয়ের সঠিক ব্যবহার করলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। আমরা নিজেরা পরিবর্তন হতে হবে, নিজেরা সচেতন হতে হবে, আইন মানি এবং পরিবারের সকলকে আইন মানার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যতে আমাদেরকে আর কোন অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা দেখতে হবে না এবং নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।



মন্তব্য করুন