জয়ন্তীকা এক্সপ্রেসে আসিফ শ্রীমঙ্গলে, জানালায় দেখলেন বৈষম্যের বাংলাদেশ

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আসিফ আকবর সম্প্রতি ঢাকা থেকে ‘জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস’ ট্রেনে চড়ে পাড়ি জমিয়েছেন চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলে। উদ্দেশ্য প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে একটি গানের চিত্রধারণ। তবে এই ভ্রমণ কেবল আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতাই ছিল না, বরং শিল্পীর চোখে ধরা পড়েছে দেশের রেল ব্যবস্থাপনা, সামাজিক বৈষম্য এবং মাদক চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্যের এক অন্ধকার চিত্র।
আসিফ আকবর তাঁর পোস্টে ট্রেনকে সাধারণ মানুষের জন্য আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী বাহন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে রেলের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে রেল কর্মীদের চেয়ে যাত্রীদের দায়িত্বহীনতাই বড় বাধা। এছাড়া স্টেশনে অসহায় মানুষ ও কুকুরের সহাবস্থান এবং রেললাইনের ধারের জীবনযাত্রাকে দেশের প্রকট আয় বৈষম্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন এই শিল্পী।
শ্রীমঙ্গলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করলেও চা শ্রমিকদের জীবনমান তাকে ব্যথিত করেছে। তিনি লিখেছেন: চা বাগানের শ্রমিকদের দুটো রুটি আর রোজ ১৭৮ টাকার মানবেতর জীবনের করুণ গল্প এই ভুলে যাওয়া জাতির মধ্যে মাঝেমধ্যে সাময়িক উত্তেজনা তৈরি করে, আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।”
তাঁর মতে, শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অটুট থাকলেও এর পেছনের দারিদ্র্যের গল্পগুলো আজও শেষ হয়নি।
ভ্রমণের এক পর্যায়ে শিল্পী এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। নরসিংদী থেকে আজমপুর ও হরষপুর পর্যন্ত এলাকাটি মাদক কারবারিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই রুটে ট্রেনের যাত্রী ও রেল পুলিশ সবাই একপ্রকার অসহায়।
আসিফ আকবর এই সমস্যার মূলে যাওয়ার চেষ্টা করে জানান যে, ২০০৯ সালে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর রেল কর্মকর্তাদের ‘ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার’ বা বিচারিক ক্ষমতা চলে গেছে। এর ফলে রেল কর্তৃপক্ষ এখন অনেকটা ক্ষমতাশূন্য বা ‘নিধিরাম সর্দার’ হয়ে পড়েছে, যা অপরাধ দমনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব সীমাবদ্ধতা আর তিক্ত অভিজ্ঞতার পরেও শ্রীমঙ্গলের প্রতি নিজের ভালোবাসা ব্যক্ত করেছেন আসিফ আকবর। এক কাপ চায়ের আমেজ আর প্রকৃতির মায়ায় যুদ্ধের দামামা ছাপিয়েও মানুষের জীবনের গল্প বেঁচে থাকবে—এমনটাই তাঁর প্রত্যাশা। তাঁর এই পোস্টটি রেলওয়ের নিরাপত্তা ও চা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবনার খোরাক দিচ্ছে।
পাঠকদের সুবিধার্থে আসিফ আকবরের ফেইসবুক পোস্ট টি হুবহু তুলে ধরা হলো : জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনে শ্রীমঙ্গল গেলাম। উদ্দেশ্য চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্যের উপর গাওয়া একটি গানের শুটিং করা। সাধারন গণপরিবহন বলতে আসলে ট্রেনকেই বুঝি। টিকেটের দাম তুলনামূলক ভাবে সস্তা, জার্নিও আরামদায়ক। বিশাল বিশৃঙ্খল জনগোষ্ঠীর দেশে অপ্রতুল লোকবল নিয়ে রেল ম্যানেজমেন্ট বাংলাদেশে একধরনের বিষ্ময়ও বটে।
জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস মোটামুটি সব স্টেশন ধরে, মানুষের ওঠানামা দেখতে ভাল লাগে। পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে রেল কর্মীদের চেয়ে আমাদের দায়িত্বহীনতাই বড় প্রতিবন্ধকতা। রেল স্টেশনগুলোয় কুকুর আর অসহায় মানুষের পাশাপাশি ঘুমের দৃশ্য হৃদয় বিদারক। রেললাইনের দুপাশে মানুষের জীবনমান দেশের জনগণের আয় বৈষম্েযর করুন গল্প মনে করিয়ে দেয়। চা বাগানের শ্রমিকদের দুটো রুটি আর রোজ ১৭৮/ টাকার মানবেতর জীবনের করুন গল্প এই ভুলে যাওয়া জাতির মধ্েয মাঝেমধ্েয সাময়িক উত্তেজনা তৈরী করে, আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। শ্রীমঙ্গলের নৈস্বর্গিক সৌন্দর্য অটুট আছে, আবার পেছনের কদাকার গল্পগুলোও শেষ হয়ে যায়নি।
নরসিংদী থেকে আজমপুর হয়ে হরষপুর পর্যন্ত মাদক কারবারীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা। এখানে ট্রেনের যাত্রী, রেল পুলিশসহ সবাই অসহায়। উদ্ধত ড্রাগ ডিলাররা ট্রেনের নিয়ন্ত্রন নিয়ে ইচ্ছামত তাদের কাজ চালায়। বিষয়টা তদন্ত করে জানলাম- রেল অফিসারদের আগে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার ছিল, বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার কারনে ২০০৯ সালে সেই পাওয়ার চলে যায়। অর্থ্যাৎ রেল কর্তৃপক্ষের কাছে কোন প্রশাসনিক ক্ষমতা নাই, তারা নিধিরাম সর্দার। সব সৌন্দর্যের পেছনের গল্প যেন টিমটিম করে জ্বলা পাদপ্রদীপের নীচের আলোর মত। তবুও শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্য অবগাহন করতেই হবে। আর এক কাপ চা ! বিশ্বের সব যুদ্ধ শেষ হলেও তোমার গল্প শেষ হবার নয়। ভালবাসা অবিরাম।



মন্তব্য করুন