কর্জে হাসানার সুফল ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

June 7, 2026,

মাওলানা বশির আহমদ : ইসলামে কর্জে হাসানা (বিনা স্বার্থে ঋণ প্রদান) একটি অত্যন্ত মহৎ ও সওয়াবের কাজ। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে অসহায়, অভাবগ্রস্ত ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য মুসলমানদের উৎসাহিত করা হয়েছে। মানুষ সামাজিক জীব; একজন অন্যজনের সহযোগিতা ছাড়া চলতে পারে না। জীবনের নানা প্রয়োজনে, বিপদে-আপদে বা জরুরি পরিস্থিতিতে একজন মানুষ অন্যজনের নিকট কর্জ চাইতেই পারে। এমন অবস্থায় সামর্থ্যবান ব্যক্তির উচিত মানবিক ও ইসলামী দায়িত্ববোধ থেকে তাকে সহযোগিতা করা।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমান সমাজে কর্জে হাসানার এই সুন্দর সংস্কৃতি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর অন্যতম কারণ হলো কিছু মানুষের অসততা ও দায়িত্বহীনতা। অনেকেই প্রয়োজনের সময় অত্যন্ত বিনয় ও কাতরতার সাথে কর্জ গ্রহণ করেন, কিন্তু পরিশোধের সময় নানা অজুহাত দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করেন। একবার নয়, বারবার তারিখ দেন, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন, এমনকি পাওনাদার টাকা চাইলে বিরক্তি বা রাগও প্রকাশ করেন।

ফলে যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং মানবিক বিবেচনায় অর্থ ধার দিয়েছিলেন, তিনিই পরে নিজের টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তাকে বারবার স্মরণ করাতে হয়, অনুরোধ করতে হয়, কখনো কখনো পাওনাদারের পেছনে পেছনে ঘুরতেও হয়। কর্জদাতা যেন নিজের টাকা ফেরত চাইতেও সংকোচ বোধ করেন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নৈতিক অবক্ষয়ের একটি স্পষ্ট চিত্র।

প্রকৃতপক্ষে কর্জের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, বিশ্বাস ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। একজনের বিপদে অন্যজন এগিয়ে এলে সামাজিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়। কিন্তু কিছু অসাধু ও দায়িত্বহীন মানুষের আচরণের কারণে আজ অনেকেই কর্জ দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। ফলে প্রকৃত অভাবগ্রস্ত ও সৎ ব্যক্তিরাও প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ইসলাম কর্জ গ্রহণকারীকে সময়মতো ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। হাদিসে এসেছে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা জুলুমের শামিল। একজন মুমিনের উচিত কর্জ গ্রহণের সময় যেমন আন্তরিকতা দেখানো হয়, পরিশোধের সময়ও তার চেয়ে বেশি দায়িত্বশীলতা ও সততার পরিচয় দেওয়া।

আমাদের সমাজে কর্জে হাসানার এই মহৎ সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে হলে পারস্পরিক আস্থা, সততা ও দায়বদ্ধতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। কর্জ গ্রহণকারীকে মনে রাখতে হবে, এটি শুধু মানুষের হক নয়; এর সাথে আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতার বিষয়ও জড়িত। আর কর্জদাতার উচিত যথাসম্ভব সহানুভূতিশীল হওয়া। উভয় পক্ষ নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে সমাজে ভালোবাসা, সহযোগিতা ও মানবিক মূল্যবোধ আরও শক্তিশালী হবে।

লেখক : মাওলানা বশির আহমদ, মৌলভীবাজার সদর।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com