(ভিডিওসহ) ভিটে মাটি বিক্রি ও ধার দেনা করে পাড়ি দেন ওমানে;মৌলভীবাজারের ৩ যুবক নিহত :পরিবারে চলছে শোকের মাতম

এস এম উমেদ আলী॥ ভিটে মাটি বিক্রি করে ওমানে পাড়ি দিয়ে ছিলেন পরিবারে সচ্ছলতা ফিরে আনবেন। কিন্তু একটি দূর্ঘটনা সেই স্বপ্ন নিমিশেই শেষ করে দিল। ওমানের আদম এলাকায় একটি প্রাইভেট কার ধাক্কা দিয়ে মৌলভীবাজারের ৩ জনের প্রাণ কেড়ে নিল। নিহতের ঘটনা নিজ এলাকায় পৌছলে শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রবাসীদের মাধ্যমে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহত ৩ জনের গ্রামের বাড়িতে শুরু হয় শোকের মাতম। ২ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ওমানের জুবার আদম এলাকায় এই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে।
ওমানের ওই এলাকায় কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিক ও নিহতদের পরিবার সূত্রে জানা যায় স্থানীয় সময় ৪টার দিকে কাজ শেষে স্ব স্ব বাসায় বাইসাইকেল যোগে বাসায় ফেরার সময় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেট গাড়ির ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই ৩ মৃত্যু হয়। এদের বাড়ি মৌলভীবাজারে।
মর্মান্তিক এ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের বিলেরপার গ্রামের লিয়াকত আলী (৩৩), শরীফপুর ইউনিয়নের সঞ্জরপুর গ্রামের সবুর আলী (৩২) ও কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের চিতলীয়া বাজারের টিলালাইন এলাকার আলম মিয়া (৩৭)।
কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের সঞ্জরপুর গ্রামের মরহুম শহীদ আলীর পুত্র সবুর আলী ভিটে মাটি বিক্রি করে প্রায় ৪ বছর আগে পাড়ি দেন ওমানে। যাওয়ার সময় স্ত্রী আছিয়া বেগম, তার ২ মেয়ে ও ১ এক পুত্রসন্তানকে রেখে যান একই এলাকায় শ্যালিকার বাড়িতে। তার সপ্ন ছিল ওমানে রোজগার করে আবার দেশে ফিরে নিজের জন্য বাড়ি কিনবেন। কিন্তু সে সপ্ন তার পূরন হলোনা।
দূর্ঘটনার দিন সকালে মুঠোফোনে কথা হয় তার বড় মেয়ে ৮ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তারের সাথে। এসময় তার বৃদ্ধ মা আনোয়ারা বেগম ও স্ত্রী আছিয়া বেগম, ছেলে বিল্লাল হোসেন ও গর্ভে থাকা অবস্থায় প্রবাসে পাড়ি দেওয়ায় চোখে না দেখা ছোট মেয়ে নাদিয়া আক্তারেরও খোঁজ খবর নেন। এটাই ছিল তার পরিবারের সেই কথা।
সবুর আলীর প্রতিবেশী ইউপি সদস্য জাফর আলী, চাচাত ভাই মামুন আল বারী জানান, ভিটে মাটি বিক্রি করে ওমান যাওয়া সবুর আলীর স্বপ্ন ছিল পরিবারের মাথাগুজার ঠাঁই করার। নিজের ভিটে মাটি কিনে তাতে ঘর বাড়ি তৈরী করার কিন্তু সে স্বপ্ন পূরণ হলনা। তারা জানান অদ্য দেশে আসার কথা ছিল। তিনি আসবেন ঠিকই কিন্তু সাদা কাপড়ে মোড়ানো লাশ হয়ে। তাকে হারিয়ে এখন চরম অসহায় এই পরিবারটি। আামার যাদু ধন আমারে তইয়া কই গেল
একই উজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের ‘বিলেরপার গ্রামের মরহুম মুসলীম আলীর সব ছোট ছেলে লিয়াকত আলী প্রায় ৪ বছর আগে ওমানে যান। স্ত্রী ও ৯ বছর বয়সের এক পুত্র সন্তান রেখে যান। অসুস্থ মাকে চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা পাঠাতো ওমান থেকে। কথা ছিলো দেশে ফিরে মাকে বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন। কিন্তু লিায়কত লাশ হয়ে দেশে ফিরবেন এ কথা কেউ ভাবতে পারছেননা।
বাড়ির উঠানে হুইল চেয়ারে বসে নানা স্মৃতি কথা স্মরণ করে আহাজারি করছেন বৃদ্ধ মা বানেছা বেগম। সবার কাছে আবদার রাখছেন তার পুত্র ধন কে তার কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার। তার আহাজারিতে সবাই চোখের পানি ফেলছেন আর বোবা কান্নায় আকাশ বাতাস ভারি করে তোলছেন।
স্ত্রী শিরিন বেগম বলেন শনিবার ১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে তার সাথে কথা হয়েছে। তাকে লিয়াকত জানিয়েছিলেন আগামী মে মাসে দেশে আসবেন। একমাত্র ছেলে পীরের বাজার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী মোঃ তায়েফ ইসলাম জানায় বাবা আমাকে কথা দিয়েছেন কিছু দিনের মধ্যে দেশে আসবেন আমি তার দেশে আসার অপেক্ষায় আছি।
পার্শবর্তী কমলগঞ্জ উপজেলার চিৎলিয়া বাজার এলাকার আব্দুল বাছিতের ছেলে আলম মিয়া পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার আশায় বাড়িতে স্ত্রী ও ২ সন্তানকে রেখে ধার-দেনা করে ৬ মাস পূর্বে ওমানে পাড়ি দেন। বাড়িতে স্ত্রী ও ২ সন্তানকে রেখে ধার-দেনা করে ওমানে পাড়ি দেন। নিহতের স্ত্রী নাসিমা বেগম কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন প্রবাস আমার সংসার জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে। ধারদেনা করে আমার স্বামী বিদেশে গিয়েছিলেন পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে। এখন এই ধারদেনা কিভাবে পরিশোধ করবো। এ দিকে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় আলম মিয়ার পরিবারে থামছেনা কান্নার রোল। স্থানীয় ইউপি সদস্য শামীম আহমদ জানান, আলম মিয়া ৫ মাস আগে ওমানে যান। তার স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তার মৃত্যুর সংবাদে গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস পরিবারের স্বচ্ছলতার জায়গায় এখন আহাজারির মাতম চলছে সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত ৩ জনের বাড়িতে। ওমানের স্থানীয় সময় বিকেল ৪ টার দিকে কাজ শেষে স্ব স্ব বাসায় বাইসাইকেল যোগে ফেরার সময় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেটকারের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই মৌলভীবাজারের এ ৩ জনের মৃত্যু হয়। এ সড়ক ঘটনায় কুমিল্লা জেলার আরো একজন নিহত ও ১ জন বাংলাদেশী গুরুত্বর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
নিহদের পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর জোর দাবি নিহত তিনজনের লাশ যাতে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আসতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।



বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণ ইন্সুরেন্স বাধ্যতামূলক করা উচিত