বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস ২০১৮ উদযাপনে হীড বাংলাদেশ

প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ ॥ ২৪ মার্চ বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস। প্রতি বছরের মত এ বছরে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা হীড বাংলাদেশ সিলেট বিভাগের ৩টি জেলার (মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং সিলেট) প্রতিটি উপজেলা, জেলা সদর ও প্রতিটি চা বাগানে বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালন করছে। এই বছরের যক্ষ্মা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় “নেতৃত্ব চাই যক্ষ্মা নির্মুলে, ইতিহাস গড়ি সবাই মিলে” বাংলাদেশে যক্ষ্মা একটি জাতীয় স¦াস্থ্য সমস্যা। আমাদের দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩ লক্ষের অধিক লোক যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয় এবং এই রোগের কারনে প্রতি বছর বাংলদেশে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ হাজার লোকের মৃত্যু হয়। এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এর ভয়াবহতা বাংলাদেশের জন্য একটি হুমকি হয়ে দাড়াঁবে। যক্ষ্মা একটি জীবানু গঠিত সংক্রামক রোগ ইহা শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে বাতাসের মাধ্যমে মানব দেহে প্রবেশ করে এবং রোগ সৃষ্টি করে। কেবল মাত্র ফুসফুস নয়, মানুষের শরীরের যে কোন অংগে যক্ষ্মা রোগ হতে পারে। দুই সপ্তাহের অধিক কাশি, গায়ে জ্বর, ক্ষুদামন্দা এবং শরীরের ওজন কমে যাওয়া যক্ষ্মার প্রাথমিক লক্ষণ। যে কোন মানুষের এ লক্ষণ দেখা দিলে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল,সদর হাসপাতাল, বক্ষ ব্যাধি হাসপাতাল, বিভিন্ন এনজিও হাসপাতাল এবং উপজেলা হাসপাতাল যক্ষ্মা ক্লিনিকে কফ পরীক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল, বক্ষ ব্যাধি হাসপাতাল, বিভিন্ন এনজিও হাসপাতাল এবং উপজেলা হাসপাতাল যক্ষ্মা ক্লিনিকে বিনা মূল্যে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা প্রদান করছে।
হীড বাংলাদেশ বিগত ১৯৮৫ সন হতে যক্ষ্মারোগের চিকিৎসা সহ বিভিন্ন ধরনের জনসচেতন মুলক কাজ করে যাচ্ছে যার ফলশ্রুতিতে অনেক লোক যক্ষ্মা থেকে রক্ষা পেয়েছে তথাপি এখনও যক্ষ্মা রোগের প্রবণতা কমে নাই। অপুষ্টি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সচেতনতার অভাব, দারিদ্রতা এই রোগ বিস্তারে বিশেষ অন্যতম কারণ। হীড বাংলাদেশ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিগত বছরে (জানুয়ারী হতে ডিসেম্বর -২০১৭) রোগীর তথ্য মৌলভীবাজার ৪৬৮৮ জন, হবিগঞ্জে ৪৭৭৬ জন এবং সিলেট জেলায় ৫২৩৯ জন এই ৩ টি জেলায় সব ধরনের যক্ষ্মারোগীর সর্বমোট-১৪৭০৩ জন। বাংলাদেশে অন্য বিভাগগুলির তুলনায় সিলেট বিভাগ যক্ষ্মা রোগের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এর একটি অন্যতম কারন এ অঞ্চল চা বাগান দ্বারা বেষ্টিত এবং চা বগান গুলিতে টিবি রোগী সনাক্ত করণের রেটও অনেক বেশি। হীড বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ টিবি প্রকল্প প্রতিটি চা বাগানে মাঠ কর্মীর মাধ্যমে রোগী খুঁজে বের করে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসছে ও বিভিন্ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে যক্ষ্মা রোগ সম্পর্কিত সচেতনতা প্রচার কাজ করছে। যক্ষ্মারোগীদের ডটস এর মাধ্যমে ঔষধ খাওয়ানো হয়। নিয়মিত পরিমিত ও ক্রমাগত চিকিৎসা প্রদানে যক্ষ্মারোগ আরোগ্য হয়। কিছু সংখ্যক অবহেলা জনিত কারনে ও নিয়মিত ঔষধ সেবন না করায় এমডিআর নামক একটি কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে যার চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি ও কষ্ট সাধ্য। হীড বাংলাদেশ এর চ্যালেঞ্জ টিবি প্রকল্প মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার ১৫টি উপজেলার ১৮৪টি চা বাগান, ৭২টি খাসিয়া পুঞ্জি ও ৫৪টি রাবার বাগানে যক্ষা নিয়ন্ত্রনে কাজ করছে। নিজে এবং সমাজ সুুস্থ্য রাখতে যক্ষা নির্মুল করতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
হীড বাংলাদেশ এর একার পক্ষে ৩টি জেলার সকল রোগীর সনাক্ত করে চিকিৎসা সম্পন্ন করা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। যদি অত্র এলাকার সকল জনগন সচেতন হয় এবং সন্দেহজনক রোগী হাসপাতালে পাঠায় ও সকল সরকারি বেসরকারি স্বাস্থ্য কর্মীগন যক্ষ্মামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অংঙ্গীকারাবদ্ধ হয়, তবেই এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ের সফলতা আসবে।
আগেকার দিনে যক্ষা ছিল মারাত্বক একটি ঘাতক ব্যাধি। বলা হত যার হয় যক্ষ্মা, তার নাই রক্ষা। এখন বলা হয় “যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই, এ কথার ভিত্তি নাই। ” প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই যক্ষ্মা বা টিউমারকুলোসিস মানুষকে আক্রান্ত করেছে আজ ক্যান্সার কিংবা এইডস যেমন মানব সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। এক সময় যক্ষ্মা, কুষ্ঠ কিংবা পে¬গ ছিল তেমনি। বলা হয়ে থাকে চুল, নখ এবং দাঁত ছাড়া শরীরের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে যক্ষ্মা হতে পারে না। যক্ষ্মা দু’ধরণের হলেও শতকরা ৮০ ভাগ রোগীই ফুসফুসের যক্ষ্মায় ভোগে। যে সব সংক্রামক ব্যধি মহামারি আকারে মানব সমাজে বিস্তার লাভ করেছে তার মধ্যে যক্ষা সর্বাধিক জ্বরা ও মৃত্যুর জন্যে দায়ী।
যক্ষ্মা শনাক্তকারী বিজ্ঞানী রবার্ট ককে’র উদ্ভাবণীর একশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন এগেইনস্ট টিউবারকুলোসিস অ্যান্ড লাং ডিজিজের উদ্যোগে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চকে বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালনের প্রস্তাব করা হয়। ১৯৯৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন এগেইনষ্ট টিউবার কুলোসিস অ্যান্ড লাং ডিজিজের সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একাত্বতা ঘোষণা করে। তারপর থেকে সারা বিশ্বে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হয়। দিবসটি পালনের অন্যতম লক্ষ্য পৃথিবী থেকে যক্ষ্মা নির্মূল করা। সে লক্ষ্যে নানা কর্মসূচী নেয়া হয় প্রতি বছর। যার একটি প্রতিপাদ্য বিষয়ও থাকে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র যক্ষ্মা দিবস কেন্দ্রিক কর্মসূচী আর সভা সেমিনারে আলোচনার মাধ্যমেই যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যক্ষ্মা নির্মূলের জন্য এবং কাঙ্খিত লক্ষমাত্রায় পৌছানোর জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। আসুন আমরা সবাই অঙ্গীকারাবদ্ধ হই এবং যক্ষ্মা নির্মূলে ইতিহাস গড়ি।



মন্তব্য করুন