ভূমধ্যসাগরে ৫ ঘন্টা সাঁতার কাটে শামীম : ভূকশিমুল গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া

May 13, 2019,

স্টাফ রিপোর্টার॥ ভূমধ্যসাগরের তিউনিশিয়া উপকূলে নৌকাডুবির ঘটনায় নিহত শামীম আহমদের গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার উপজেলার বাদে ভূকশিমুল গ্রামে চলছে শোকের মাতম। নৌকাডুবির পর বেঁচে যাওয়া সহযাত্রী মাছুম নামের একজনের সাথে একটি বয়া ধরে শামীম দীর্ঘ প্রায় ৫ ঘন্টা সাঁতার কাটে। এক পর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে বয়া থেকে হাত ফঁসকে যায় শামীম সহ আরো কয়েক জনের। মাছুম সহ আরো কয়েকজন বেঁচে গেলেও নৌকায় থাকা অনেকেই মারা গেছেন। নিকট আত্মীয়রা অপেক্ষার প্রহর গুনছেন প্রিয় জনের লাশ কখন বাড়িতে আসবে।
তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাডুবির ঘটনায় ৭৫ জন্য অভিবাসন প্রত্যাশীদের মধ্যে শামীমও রয়েছেন। ওই নৌকায় ৫১ জন বাংলাদেশীর মধ্যে ১৪ জন জীবিত উদ্ধার হলেও ৩৭ জন এখনো নিখোঁজ। ওই দূর্ঘটনায় শামীম নিহত ও নিখোঁজ রয়েছেন।
হাফিজ মোঃ শামীম আহমদের মা রাজনা বেগমের চোখের জল শুকিয়ে এখন বাকরুদ্ধ হয়ে আছেন পুত্রশোকে। ৭ মে মায়ের কাছে ফোন দিয়ে শামীম জানায় পরদির ৮ মে ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিবে। এরপর থেকে শামীমের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। আত্মীয় স্বজনরা ঘটনার পর থেকে বাদে ভূকশিমুলের বাড়িতে আসছেন দেখা করে একটু সান্তনা দিতে তাকে ও পরিবারকে।
নিহত শামীমের বড় ভাই হাজী আবু সাইদ বাচ্চু জানান শামীম ছিলেন কোরআনে হাফেজ। সিলেট গোটাটিকরের একটি মাদ্রাসায় অধ্যয়ণরত ছিল। গেল বছর তার দাখিল পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। তার বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে ঘরের কারো জানা ছিলনা। পরিবারের কাউকে না জানিয়েই শামীম লিবিয়ায় চলে যান। লিবিয়া থেকে আপন তালতো ভাই সিলেটের গোলাপগঞ্জের শরীফগঞ্জ কদুপুরের মাছুম ও মারুফ সহ আরো বেশ কয়েকজন নৌকায় উঠেন ইতালী হয়ে ফ্রান্সে বসবাসকারী শামিমের দুই ভাই সেলিম ও সুমনের কাছে যাওয়ার জন্য। ভূমধ্যসাগরের তিউনিশিয়া উপকূলে নৌকাডুবি হলে সাগরের পানিতে এ তিনজন একটি বয়ায় দীর্ঘ প্রায় ৫ ঘন্টা সাঁতার কাঠেন। এক পর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে বয়া থেকে হাত ফঁসকে শামীম ও তালতো ভাই মারুফ সাগরে নিঁখোজ হন। মাছুম সহ আরো কয়েকজন বেঁচে যান। বেঁচে যাওয়া মাছুম ও নিঁখোজ মারুফ তারা সহোদর।
শামীম ৭ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিল। কুরআনে হাফিজ শামিম গেল কয়েক বছর রমজানে তারাবির নামাজের ইমামতি করেন বাড়ির কাছে বায়তুছ সালাম জামে মসজিদে। শামীমের এক ভাই সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার আলম সামাদ ছাড়া সবাই থাকেন প্রবাসে। ২ ভাই ফান্স আর ৩ ভাই থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে। বড় ভাই হাজী আবু সাইদ বাচ্চু সৌদি আরবে থাকলেও এখন আছেন দেশে।
বাদে ভূকশিমইল গ্রামের বশির উদ্দিন, রফিক মিয়াসহ অনেকেই জানান শান্ত ও মার্জিত স্বভাবের সদাহাস্যজ্জ্বোল শামীম তাদের গ্রামের বায়তুছ সালাম জামে মসজিদের ইমাম ছিলেন। তিনি তার বাড়ির পাশের ওই মসজিদটিতে রমজান মাসে তারাবির নামাজের ইমামতি করতেন। তারা জানান তার এমন মর্মান্তি দূর্ঘটনার এ খবর শোনার পর থেকে গ্রামবাসী শোকাহত। তার এ মৃত্যুতে পরিবারের সদস্যদের ন্যায় এলাকায়ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তারাও শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
শামীমের সাবেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাদে ভুকশিমইল মোহাম্মদীয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আফজল হোসেন ও হাফেজ রেজাউল করিম জানান ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসার প্রথমদিকের ব্যাচের ছাত্র ছিলেন হাফেজ আহসান হাবীব শামীম। ২০১৩ সালে তার হিফজ শেষ হলে অনেক মসজিদেই তারাবির নামাজ বেশ সুনামের সাথে পড়িয়েছেন। হাফিজি শেষ হওয়ার পর শামীম সিলেটের একটি আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতেন। ন¤্র ও ভদ্র স্বভাবের তাদের এই প্রিয় ছাত্রের এমন দূর্ঘটনায় তারা শোকে বিহবল। ওই শিক্ষকরা জানানেল নিখোঁজের খবর আসার পর থেকেই তারা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোরআনে খতম শেষে দোয়া করছেন।
শামীমের বড় ভাইয়ের ছেলে কামরান হোসেন ও মেয়ে ফারজানা ইসলাম দিপা কেঁদে কেঁদে বলেন ছোট চাচ্চু আমাদের খুবই প্রিয় ছিলেন। প্রায় ৩ মাস আগে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে বের হন। তিনি এমন মর্মান্তিক দূর্ঘটনায় পড়বেন তা আমরা কল্পনাও করতে পারছিনা। নাহিদ কেঁদে কেঁদে বলেন আমার প্রিয় বাইসাইকেলটি বিকেল বেলায় আর কখনই চালাবেন না চাচ্চু এই বাস্তবতাটি মেনে নিতে খুব কষ্ঠ হচ্ছে।
শামীমের পরিবার অপেক্ষার প্রহর গুনছেন কখন লাশ বাড়িতে আসবে। তারা সরকারের কাছে দাবী করছেন দ্রুত যেন লাশ দেশে আনা হয়।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com