দুপুরে পানি কমলে রাতে যেই সেই বন্যা আমাদের গিলে খাচ্ছে

ইমাদ উদ দীন॥ না এবছর আর বন্যা কমবেনা। বন্যা আমাদের পিছু নিয়েছে। আমাদের সব গিলে খেয়ে এখন আমাদেরও খেতে চাচ্ছে। ঘরে চাল নেই। ভাত নেই। খানি নেই। শুধুই নেই আর নেই। আছে যা তা শুধু পানি আর হাহাকার। এবাকার দফায় দফায় বন্যায় আমরা নি:স্ব। এমন দূর্বিষ জীবন আর ভাল লাগেনা। একটু পানি কমলে বৃষ্টি তা ভরিয়ে দিচ্ছে। তাই বন্যার পানি কমে যাওয়ার আশা করি কি ভাবে। হাওর তীরের শাহপুর,সাদিপুর,মিরশংকর,মহেশঘরি ও বাদে ভূকশিমল গ্রামের বাসিন্ধা কয়েছ আহমদ বটলাই, গুলজার মিয়া,বদর উদ্দিন, বাছির মিয়া,অজির আলী, লিচু মিয়া,শামীম মিয়া,নেওয়া বিবি ও আখলিমা বেগমসহ অনেকেই ক্ষোভে কষ্ঠে তাদের দূর্ভোগ,দূর্দিন আর চলমান বন্যার সার্বিক অবস্থা তুলে ধরেন। তারা কান্না জড়িত কন্ঠে জানালেন তাদের চরম অসহায়ত্বের কথা। বোরো ধান হারানোর পর থেকে এবছর কিভাবে একের পর এক বন্যায় তাদের সব কেড়ে নিয়েছে। সব হারিয়ে কিভাবে তারা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাদের সাথে আলাপে জানাগেল চলমান এ বন্যা দীর্ঘস্থায়ী রুপ নিচ্ছে। জেলায় ৩য় দফার এই বন্যার প্রায় মাস দিন। কিন্তু পানি কমার কোন লক্ষণই নেই। উজানের পাহাড়ি ঢল আর টানা ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে বন্যা দূর্ভোগ। হাকালুকি হাওর তীরের স্থানীয় বাসিন্ধারা জানান দুপুরে পানি কিছু কমতে দেখা গেলে বিকেল কিংবা রাতের টানা বৃষ্টিতে আবার যেই সেই।

এতে হাওর পাড়ের তীরবর্তী উচুঁ অংশের কিঞ্চিত উন্নতি হলেও নিন্মাঞ্চলের অবস্থা আগের মতই। সম্প্রতি আবহাওয়ার অবস্থা এই ভালো এই খারাপ। এমন অবস্থায় বন্যা পরিস্থিতির কখনো কিছুটা উন্নতি হলে, আবারও অবনতি হচ্ছে। এতে করে বন্যা পরিস্থিতির আশানুরুপ উন্নতি লক্ষকরা যাচ্ছেনা। হাকালুকি হাওর তীরের ৩ উপজেলার গ্রামীণ জনপদের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। ৩ উপজেলার (কুলাউড়া,জুড়ী ও বড়লেখা) প্রায় ২৫টি ইউনিয়নের দুই শতাধীক গ্রামের রাস্তা ঘাট,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,হাটবাজার,ঘরবাড়ি,ধর্মীয় উপসনালয় এখনো পানি বন্ধী। প্রায় ৩ লক্ষাধিক মানুষ বানের পানিতে রয়েছেন বন্ধি দশায়। ওই এলাকা গুলোর রাস্তা ঘাট আর ঘরবাড়িতে এখনো কমর থেকে বুক পানিতে নিমজ্জিত। ঘরবাড়ি বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের দূর্ভোগের অন্ত নেই। বন্যায় তাদের মাথাগুঁজার ঠাঁই যেমন কেড়ে নিয়েছে। তেমনি রান্নাঘর,টিবওয়েল আর টয়লেটও পানিতে তলিয়ে দিয়েছে। তাই প্রয়োজনীয় নিত্য ব্যবর্হায এই উপাদানগুলো পানিতে ডুবে যাওয়ায় তাদের অবর্ণীয় দূর্ভোগ। এবছর হাকালুকি হাওর তীরের মানুষ এনিয়ে ৩য় দফায় বন্যা কবলিত হল। বলতে গেলে হাকালুতি হাওর পাড়ের বাসিন্ধারা প্রায় ৪ মাস থেকে পানি বন্ধি। এবছর চৈত্রের ভয়াবহ অকাল বন্যার দকল সামলে উঠার আগেই পর পর একাধীক বন্যা। একের পর এক বন্যায় তাদের জীবন জীবীকার সব উপকরনই কেড়ে নিয়ে তাদের নি:স্ব করেছে। আর চলমান এ বন্যায় ডুবিয়ে দিয়েছে তাদের শেষ আশ্রয়স্থল। তাদের চোখের সামনেই সবই তলিয়ে গেছে বানের পানিতে। এখন চারদিকে শুধু থৈ থৈ পানি আর পানি। ঘরবাড়ি পানিতে ডুবেগেলেও আশ্রয় নিয়েছেন অন্যত্র। আশ্রয় কেন্দ্র বা নিজের আতœীয় স্বজনদের বাড়িতে। কিন্তু সেখানেও ভালো নেই তারা। পিছু নিয়েছে নানা সমস্যা আর বিড়ম্বনা। হাওর তীরের কৃষি আর মৎস্যজীবী মানুষগুলো কর্মহীন থাকায় নেই আয় রোজগারও। তাই পরিবার পরিজন নিয়ে তারা এখন অর্ধহারে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। চরম অসহায় এ মানুষগুলোর দু’চোখের অশ্রুই যেন তাদের সান্তনার ভাষা। তাদের মত অসহায় ওই এলাকার গৃহগালিত পশুগুলোও। খাদ্য আর বাসস্থান হারিয়ে তারাও পড়েছে চরম সংকটে। খাদ্যহীন গৃহহীন মানুষ গুলোর দুর্ভোগ আর মানবেতর জীবনযাপন এখন তাদের নিত্যসঙ্গী। বানভাসি অসহায় মানুষগুলো রাত পোহালেই ত্রাণের আশায় পথের পাণে চেয়ে থাকেন। জীবন বাচাঁতে পেটের দায়ে। কিন্তু তারা হতাশ হচ্ছেন। কারন তারা দূর্দিনে পাচ্ছেন না আশানূরুপ সাহায্য।
সরকারী তরফে যে সহযোগীতাগুলো আসছে তা যেমন পর্যাপ্ত নয়। তেমনি যে বরাদ্দ গুলো আসছে তাও পুরোপুরি ভাবে পৌঁচাচ্ছেনা তাদের হাতে। এনিয়ে জনপ্রতিনিধিদের উপর তাদের অভিযোগ আর ক্ষোভের অন্ত নেই। আর এবারের বন্যায় ব্যাক্তি,প্রতিষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ হচ্ছে একেবারেই কম।
মুঠোফোনে জেলা ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন ও সরজমিনে স্থানীয় বাসিন্ধাদের সাথে আলাপে জানা যায়,জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অনেকটা অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে জেলার হাকালুকি ও কাউয়াদিঘি হাওর তীরের কুলাউড়া,জুড়ী,বড়লেখা,রাজনগর ও মৌলভীবাজার এই পাঁচটি উপজেলার প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষ এখনো পানিবন্দী। কুশিয়ারা নদী, হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরে পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার ৫টি উপজেলার প্রায় ৩০ টি ইউনিয়নে বন্যা স্থায়ী রুপ নিচ্ছে। বানের পানি কিছুটা কমলেও তা স্থির থাকছেনা। প্রতিদিনই বৃষ্টি হওয়ায় তা আগের অবস্থায় চলে আসছে। জানা যায়, জেলার ৩০টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। এতে প্রায় ২লক্ষ ৭০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। এ পর্যন্ত ৩০টি আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন প্রায় সাড়ে ৫ শতাধিক পরিবার। এ ছাড়া ২০০ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যাকবলিত থাকায় পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তলিয়ে গেছে কয়েক শতাধিক মৎস্য খামার। বন্যায় মৌসুমী সবজি, আউশ ও রোপা আমনেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সকলেই আশাবাদী আবহাওয়ার অবস্থা ভালো হয়ে বৃষ্টি থামলেই বানের পানি স্থায়ীভাবে কমতে শুরু করবে।



মন্তব্য করুন