হাওরপাড়ের মৎস্যজীবীদের দূর্দিন

July 13, 2017,

ইমাদ উদ দীন॥ বার বার বন্যা। ভাসমান পানি। এমন দিনে জালে মাছ ধরাপড়ত বেশমার। ছোট বড় মাছে সয়লাব থাকত বাজার। হাওর তীরের স্থানীয় বাজার গুলোতে থাকত জমজমাট কেনা বেচা। কিন্তু ভিন্নতা এবছর। জালে মাছ মিলছে কম। রাতদিন মাছ ধরে পরিবারে ভাতের যোগান হচ্ছেনা। এবছর হাওরে যেমন পানি। তেমনি ঘরেও পানি। বানের পানি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ঠাঁই নিয়েছে ঘরবাড়ি আর হাওরে। তাই হাওর পাড়ের জেলে পরিবারে দু:খ দূর্দশার শেষ নেই। দিন দিন বেড়ে চলেছে নানা সমস্যা আর সংকট। এমন দূর্ভোগ থেকে মিলছেনা মুক্তি। এবছর একের পর এক বন্যা আর দূর্ভোগ পিছু নিয়েছে তাদের। এখন হাওর পাড়ের মৎস্যজীবীদের চরম দূর্দিন। অর্ধহারে অনাহারে দিন কাটছে হাওর তীরের জেলে পরিবারের।এবছর প্রাকৃতিক দূর্যোগে ধান নেই। মাছও কম। সবই হারিয়ে নি:স্ব হাওর তীরের মৎস্যজীবী মানুষ। এখন মাছের ভর মৌসুম। কিন্তু জেলেরা জাল ফেলে হচ্ছেন হতাশ। কারন মিলছেনা আশানুরুপ মাছ। তাছাড়া ভাসমান পানিতে মাছ ধরা নিয়েও রয়েছে নানা বাধা বিপত্তি। হাকালুকি হাওর পাড়ের মৎস্যজীবী আলী হোসেন মিশিল,কয়েছ আহমদ বটলাই,গুলজার মিয়া, সুধাংশু দেব, লইক মিয়া,তমিজ আলীসহ অনেকেই জানালেন কয়েক দফায় বন্যায় কারনে এখন হাওরে দেশীয় প্রজাতির নানা জাতের মাছ এসেছে। তীরবর্তী গ্রাম গুলোর পকুর ও মৎস্যখামারের মাছ বানের পানির তোড়ে ভেসে হাওরে এসেছে। ১ম দফা বন্যায় বোরো ধান পচাঁর পর বিষক্রিয়ায় মাছের মড়কের পর দেশীয় প্রজাতির মাছের জন্য যে আকাল ছিল তা অনেকটা পূরণ হয়েছে। বিল গুলোতে এখন পর্যাপ্ত মাছ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমরা বিলের সীমানা ৫-১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে বাধা নিষেধ থাকায় মাছ ধরতে পারিনা। আর ভাসমান পানি থাকায় হাওরের তীরবর্তী এলাকায় মাছ মিলছে কম। তারা জানালেন এবছর একটি বোরো ধানও ঘরে তুলতে পারেননি।

বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার পর শুরু একের পর এক দূর্যোগ। এবছর হঠাৎ উত্তাল হাওর রাক্ষুসে হয়ে সবই গ্রাস করেছে। তাই দূর্দিনে হাকালুকি হাওর তীরের মৎস্যজীবীরাও। এ সংকট কাটাতে নেই তাদের সহায় সম্বল। এপর্যন্ত আশানুরুপ কোন সহায়তা না পাওয়ায় তারা অসহায়। প্রতিদিনই আগেরমত জাল নিয়ে ছুটে চললেও তা হচ্ছে অসার। কারন ৩য় দফা বন্যায় হাওরের তীরবর্তী এলাকায় ভাসমান পানিতে মাছ নেই বললেই চলে। এখন তাদের আয় রোজগারও নেই। তাই পরিবারের খাওয়া বাঁচা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ উৎকন্ঠা। স্থানীয় মৎস্যজীবীরা জানালেন মড়কের পর হাওর তীরবর্তী এলাকায় জালে মাছ ধরা পড়ছে কম। ৩য় দফার বন্যা আর চলমান বর্ষণে এখন পানিতে টইটুম্বর হাওর হাকালুকি। অনান্য বছর এসময় নানা জাতের দেশীয় প্রজাতির মাছ জালে ধরা পড়লেও এবছর ভিন্ন চিত্র। সারা দিন জাল ফেলেও মিলছেনা পর্যাপ্ত মাছ। তারপরও পরিবারের জীবীকার প্রয়োজন, অলস সময় আর নেশার টানে ভাসমান পানিতে জাল ফেলছেন মৎস্যজীবীরা। কিন্তু অনেকটা হতাশ হয়ে ফিরছেন বাড়িতে। এবছর চৈত্রের অকাল বন্যায় তাদের স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে। টানা ভারী বর্ষণ আর উজানের পাহাড়ী ঢল কেড়ে নিয়েছে তাদের সোনালী ফসল। বোরো ধানের পর মরছে মাছ। গবাদি পশু আর জলজপ্রাণী ও উদ্ভিদ। উত্তাল হাওর একে একে গিলে খেয়েছে সব সম্পদ। এখন চলমান বন্যায় বসত ভিটাও কেড়ে নিতে চায়। এমন দুঃসময়ে বেকারত্ব গুছাতে মিলছেনা অন্য পেশাও। গতকাল সরজমিনে হাকালুকি হাওর পাড়ের জেলে পল্লী হিসেবে পরিচিত সাদিপুর,কুরবানপুর,মিরশংকর,তেঘরিঘাট,আলীনগর, ফতুনগর, শাহপুর, ও বেলাগাঁও এলাকায় গেলে মৎস্যজীবীরা কান্নাজড়িত কন্ঠে তুলে ধরেন তাদের অসহায়ত্বের কথা। জানালেন জন্মের পর এত বড় দূর্যোগ আর দেখেননি তারা। অনান্য বছর বন্যা হলেও কিছু ধানও ঘরে তুলতে পেরেছেন। বানের পানিতে ধান গেলেও প্রচুর মাছ পেয়েছেন। কিন্তু এবছর ভিন্ন। বোরো ধানের সাথে মরেছে মাছও। দফায় দফায় বন্যার পানি বসত ভিটা গিলে খেতে চাইছে। তাদের এলাকার প্রতিটি বাড়িতে হাটু কিংবা কোমর পানি। জেলে পল্লীর বাসিন্ধারা   জানালেন এখন পর্যন্ত তারা সরকারী তরফে কোন উল্লেখযোগ্য সহায়তা পাননি। অকাল বন্যার পর হাওর পাড়ের মানুষের জন্য ওএমএস বা ভিজিএফের যে ত্রাণ সহায়তা এসেছিল তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল থাকায় ওই সহায়তাও সবার  কপালে জুটেনি। আর গেল কয়েকদিন থেকে তাও বন্ধ হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে এলাকার দু’ চার পরিবার সরকারী বা বেসরকারী ত্রাণ সহায়তা পায় তা দিয়ে কোন রকম বেঁেচ থাকে। ওই এলাকায় দরিদ্র লোকসংখ্যা বেশি হওয়ায় আর ত্রাণ সহায়তা অপর্যাপ্ত থাকায় তা সবাই সমহারে পান না বলে তারা অভিযোগ করেন। জেলারা জানালেন হাকালুকি হাওরের বিল গুলোতে প্রচুর দেশীয় প্রজাতির মাছের দেখা মিলছে। চলমান ৩য় দফার বন্যা,ভারী বৃষ্টি আর নদী ভাঙ্গনে হাওরের তীরবর্তী এলাকার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে পুকুর ও মৎস্য খামারের মাছ প্লাবনের পানিতে ভেসে হাওরে আসে।

এবছর ধান পচে প্রচুর খাবার থাকায় ওই মাছ গুলো হাওরের বিল এলাকায় চলে যাওয়াতে হাওরের তীরবর্তী ভাসমান পানিতে জালে মাছ ধরা পড়ছে কম। আর বিল এলাকায় মাছ ধরা পড়লেও ইজারাদারদের কারনে মাছ ধরাতো দূরের কথা নৌকা নিয়ে বিলের পাশ দিয়েও যাতায়াত করা কষ্টকর। হাওর পাড়ের স্থানীয় কন্টিনালা বাজার, আশুরিঘাট,ইসলামগঞ্জ বাজার ঘাট ও ঘাটের বাজারে প্রতিদিনই পর্যাপ্ত মাছ উঠলেও এবছর উল্টো চিত্র। আগেরমত নেই পাইকারী কিংবা খুচরা মাছ ক্রেতা বিক্রেতার হাকডাক।এখন পুঁটি,ট্যাংরা,মলা,দাড়কিনা,কাশখয়রা আর ছোট চাঁদাজাতীয় মাছ ছাড়া জেলেদের জালে ধরা পড়ছেনা বড় মাছ। তাই স্থানীয় মাছের বাজার গুলোরও ক্রয় বিক্রয় কার্যক্রম অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে  হাকালুকি হাওর তীরবর্তী এলাকায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ৪ হাজার। এবছর দূর্যোগের পর হাওরে মাছের ঘাটতি পোষাতে বিল নার্সারির (হাওর এলাকার বিল বা পুকুরে পোনা উৎপাদন) জন্য ২৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ মিলে। অপরদিকে হাওরে রুই,কাতলা ও মৃগেল জাতীয় পোনা অবমুক্তের জন্য বরাদ্দ মিলে ২৮ লাখ টাকা। হাকালুকি হাওর তীরের উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তারা জানান বরাদ্দকৃত এসকল মাছ অবমুক্ত হওয়াতে হাকালুকি হাওরে মড়কের ক্ষতি পোষিয়ে উঠতে সহায়ক হিসেবে ভালো ভূমিকা রাখবে।  কুলাউড়া উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. সুলতান মাহমুদ বলেন দফায় দফায় প্রাকৃতিক দূর্যোগে বির্পযস্ত হাওর পাড়ের মৎস্যজীবীরা। চলমান ৩য় দফার বন্যায় তাদের বসতঘরেও পানি। সবমিলিয়ে এবছর তাদের চরম দূর্দিন যাচ্ছে। তবে পানি কমতে শুরু করলে তাদের জালে প্রচুর মাছ ধরা পড়বে বলে আশা করছি। কারন ক্ষতি পোষাতে এবছর সরকারী উদ্যোগে প্রচুর পরিমান পোনামাছ অবমুক্ত করা হয়েছে। এবছর হাওরে যে পরিমান খাদ্য সৃষ্টি হয়েছে তাতে দ্রুত মাছ বৃদ্ধি পাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। হাকালুকি হাওর তীরের ভুকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো.আজিজুর রহমান মনির জানান,এখন পর্যন্ত মৎস্যজীবী হিসেবে আলাদা কোনো ত্রাণ দেওয়া হয়নি। তবে সরকারী যে ত্রাণ সহায়তা আসছে তা তাদেরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com