কুলাউড়া উপজেলা প্রকৌশলীর অপকর্ম আড়ালে অভিনব কৌশল ১০ কোটি টাকা বরাদ্ধ দেয়ার কথা বলে চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে প্রকল্পের তালিকা গ্রহণ

মাহফুজ শাকিল॥ মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার ১৩টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা উপজেলার মাসিক সমন্বয় সভায় উপজেলা প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম মৃধার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে অনাস্থা প্রস্তাব করেন। পরবর্তীতে পরিষদের সাধারন সভায় অভিযোগটি রেজ্যুলেশন করে অভিযোগটি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রলাণয়ের মন্ত্রী ও এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলীর কাছে প্রেরণ করা হয়।
বিষয়টিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে তিনি নানা প্রতারণার আশ্রয় নেন ওই প্রকৌশলী। তিনি ইউপি চেয়ারম্যানদের ‘আমার গ্রাম,আমার শহর’ প্রকল্পের নামে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের একটা তালিকা জমা দিতে বলেন। উপজেলা প্রকৌশলী (আমিনুল) প্রকল্পগুলোর তালিকা সরাসরি তাঁর কাছে জমা দিতে হবে। তখন ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছে বিষয়টি ধরা পড়ে এবং তারা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে বিষয়টি খুলে বলেন। মুলত নিজের অপকর্ম আড়াল করতে তিনি প্রকল্পের নামে চেয়ারম্যানদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন।
কুলাউড়া উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এলজিইডি প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম মৃধার অনিয়ম দুর্নীতির তদন্ত রোববার ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ঢাকার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী নুরুল হুদার নেতৃত্বে ৩ সদস্যের কমিটি অভিযোগের তদন্ত করেন। এসময় তদন্ত কমিটির অন্য ২ সদস্য সিলেটের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নির্মল কুমার বিশ্বাস ও মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী আজিম উদ্দিন সরদার উপস্থিত ছিলেন।
তদন্ত কমিটির কাছে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ভুক্তভোগী চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, এলজিইডি ঠিকাদারসহ অর্ধশতাধিক ভুক্তভোগী উপজেলার এলজিইডি প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম মৃধার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য তুলে ধরেন। সেই সাথে অভিযুক্ত উপজেলা প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম মৃধাকে প্রত্যাহার ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
অভিযোগকারীরা জানান, বরাদ্দকৃত কাজের বিল পাস করাতে হলে আমিনুল ইসলাম মৃধাকে ১০ পার্সেন্ট থেকে ২০ পার্সেন্ট কমিশন দিতে হয়। নতুবা তিনি কোন বিলের ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করেন না। টাকা ছাড়া একাধিকবার তাঁর কাছে গেলে কোন কাজ হয় না। এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র সংস্কার কাজের ২ লাখ টাকা বরাদ্দেও তাকে ৫ হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। টাকা না দিলে কাজের প্রত্যয়ন দিতে চান না। শিক্ষকদের সাথে খারাপ আচরণেরও অভিযোগ প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম মৃধার বিরুদ্ধে।
কর্মধা ইউপি চেয়ারম্যান মুহিবুল ইসলাম আজাদ জানান, তিন সপ্তাহ আগে প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম মৃধা আমাকে জানান ‘আমার গ্রাম,আমার শহর’ প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ইউনিয়নে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দ পাওয়া যাবে। এজন্য স্কীম আকারে প্রকল্প তৈরি করে দিতে হবে। আমি তাঁর কথায় প্রকল্প তৈরি করে দিয়েছিলাম। বিষয়টি জেনে আমার ইউনিয়নের বাসিন্দারা আনন্দে মিষ্টি বিতরণ করেছেন। পরে জানতে পারি এ প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ইউনিয়নে এরকম বিশাল বাজেটের কোন বরাদ্দ নেই। তার এরকম প্রতারণায় এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে বিভ্রান্তিতে পড়েছি।
কুলাউড়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান মোছাদ্দিক আহমদ নোমান বলেন, প্রকৌশলী অফিস থেকে বলা হয়েছে ৭ কোটি টাকার প্রকল্প তৈরি করে দিতে। ঘোষনা অনুযায়ী তালিকা জমা দিয়েছে। এখন যদি এই প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন না হয় তাহলে জনগণের কাছে আমরা জনপ্রতিনিধিরা নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হবো।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রকৌশলী আমিনুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করলে ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্যে নেয়া সম্ভব হয়নি।
৩ সদস্যের কমিটির প্রধান নুরুল হুদা তদন্ত শেষে জানান, একজন উপজেলা প্রকৌশলী নয় এলজিইডি ডিপার্টমেন্টের কারো ক্ষমতা নেই ১০ কোটি ইউনিয়নে বরাদ্ধ দেয়ার। এটা যদি কেউ বলে থাকে তাহলে সে ভূল বলেছে, এটা বিভ্রান্তিকর।
তদন্ত কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, সবার সামনে তদন্ত অনুষ্ঠিত হলো। আমরা তদন্ত প্রতিবেদন যথাসময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা করবো। যেহেতু বিষয়টি তদন্তাধীন, তাই এর বেশি আর কিছু বলতে চাই না।
উল্লেখ্য, কুলাউড়া উপজেলা প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম মৃধার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে উপজেলার ১৩ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সেখ মোহাম্মদ মহসিন সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী নুরুল হুদার নেতৃত্বে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করেন এবং বিষয়টি তদন্তক্রমে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দেন।



মন্তব্য করুন