দেড় মাসেও ফাহমিদার মৃত্যুর রহস্য বের করতে পারেনি পুলিশ

October 29, 2022,

মাহফুজ শাকিল॥ কুলাউড়া উপজেলায় একটি বসতবাড়ির পাশের ডোবা থেকে স্কুলছাত্রী দিলরুবা জান্নাত ফাহমিদার (১১) লাশ উদ্ধারের দেড় মাসেও রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। এই ঘটনায় প্রথমে কুলাউড়া থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়। পরে ফাহমিদার মা ছইফা আক্তার স্থানীয় বাসিন্দা প্রবাসী আব্দুল কালামের ছেলে মুদি দোকানদার আবু বক্কর শাহাজানকে (২৫) প্রধান আসামি করে আদালতে হত্যা মামলা করেন।
১৯ সেপ্টেম্বর করা ওই মামলার অন্য আসামিরা হলেন আব্দুল¬া মিয়ার ছেলে আব্দুল ওদুদ (৩০), আবু বক্কর শাহাজানের মা রাবিয়া বেগম (৪৮), রইছ আলীর স্ত্রী সেলিনা বেগম (৩৫) ও মাসুম মিয়ার স্ত্রী শারমিন বেগম (২৬)।
এ ঘটনায় শাহাজান ও তার মা রাবিয়া বেগম বাড়িঘর ছেড়ে গরু-ছাগল নিয়ে পালিয়ে গেছেন। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের নেই কোনো তৎপরতা।
এর আগে ১১ সেপ্টেম্বর দুপুরে উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নের কাজিরগাঁও গ্রামে আবু বক্কর শাহাজানের বসতবাড়ির পেছনে একটি ডোবা থেকে ফাহমিদার লাশ উদ্ধার করা হয়। ফাহমিদা একই এলাকার আকমল আলীর দ্বিতীয় মেয়ে। সে রাউৎগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী মানববন্ধন করে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়।
টিলাগাঁও ইউনিয়নের কাজিরগাঁও এলাকায় গেলে জানা যায়,ভিকটিমের পরিবার ও এলাকাবাসীর সন্দেহ,আবু বক্কর শাহাজান ফাহমিদাকে হত্যা করে ডোবায় ডুবিয়ে রাখেন। ঘটনার দিন সকাল ৯টা থেকে পলাতক হন শাহাজান। পরদিন তার মাও বসতবাড়ির গবাদি পশুসহ বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। এতে প্রমাণিত হয় যে, তারা এই মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
ফাহমিদার মা ছইফা আক্তার বলেন, ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টায় আমার বড় মেয়ে নাঈমা ও ছোট মেয়ে ফাহমিদা পাশের বাড়ির বাসিন্দা আবু বক্কর শাহাজানের দোকানে চিনি আনতে যায়।
এ সময় আসামি শাহাজান বড় মেয়ে নাঈমার কাছে চিনি দিয়ে ছোট মেয়েকে তার মায়ের সঙ্গে দরকার আছে বলে তাদের বাড়িতে ডেকে নেন। তখন নাঈমা চিনি নিয়ে বাড়ি ফিরলে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি ফাহমিদা কোথায়? তখন সে আমাকে জানায়,ফাহমিদা শাহাজানের বাড়িতে গেছে।
ছইফা আক্তার বলেন, প্রায় এক ঘণ্টা পর মেয়েকে খোঁজাখুঁজি করার পর শাহাজানের বাড়িতে যাই। সেখানে গিয়ে শাহাজানকে ভেজা ও কাদাযুক্ত অবস্থায় দেখি। এ সময় আমাকে দেখে শাহাজান হতবাক হয়ে যান। আমি মেয়ের কথা জিজ্ঞেস করলে শাহাজান অসংলগ্ন কথাবার্তা শুরু করেন। শাহাজানের আচরণ সন্দেহজনক হলে মেয়েকে বাড়ির আশপাশে খুঁজতে থাকি। আমার চিৎকার শুনে স্বামী আকমল মিয়া ক্ষেতের জমি থেকে দৌঁড়ে আসেন। এ সময় বিবাদী শাহাজান দৌড়ে বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় তাদের ঘরের পাশে ডোবা দেখিয়ে বলেন যে, এইখানে খোঁজ করেন। শাহাজানের দেখানো জায়গায় আমার স্বামী এসে দেখতে পান কাদামাটি স্তুপাকারে রয়েছে। তখন আমার স্বামীর সন্দেহ হলে ওই ডোবাতে নেমে পা দিয়ে কাদা সরান। কাদার নিচে ফাহমিদাকে দেখতে পেয়ে চিৎকার শুরু করি। আশপাশের লোকজন এসে ফাহমিদার লাশ উদ্ধার করে বিবাদীর বাড়ির উঠানে রাখি। এ সময় ফাহমিদার ঘাড়ের মধ্যে লাল দাগ দেখা যায়।
খবর পেয়ে পুলিশ এসে ফাহমিদার লাশের সুরতহাল তৈরি করে। এ সময় শাহাজানসহ সব আসামি বাড়ি থেকে পালিয়ে যান।
ছইফা আক্তার বলেন, আমার ধারণা শাহাজান ও তার মা রাবিয়া বেগম আমার নিষ্পাপ মেয়ে ফাহমিদাকে ঘরে ডেকে নিয়ে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে বিবাদীদের সহযোগিতায় শ্বাসরুদ্ধ বা আঘাত করে হত্যা করে তাদের বাড়ির পাশের ডোবায় কাদামাটিতে লাশ পুঁতে রাখে।
ফাহমিদার বড় বোন মাহবুবা জান্নাত নাঈমা বলেন, ঘটনার দিন আমার বোন ফাহমিদাকে নিয়ে আমি শাহাজানে দোকানে চিনি আনতে যাই। ওই ছেলে আমার সঙ্গে অশ¬ীল আচরণ করে। তখন ছোট বোন বিষয়টি আমার মাকে বলে দেবে বলে হুমকি দেয়। এরপর তাদের বাড়িতে তার মায়ের দরকার আছে বলে ডেকে নেয়। পরে আমি চিনি নিয়ে বাড়িতে চলে আসি এবং আমার মাকে বিষয়টি জানাই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর বোনের লাশের খবর পাই। তখন ওই ছেলেটিকে ভেজা কাপড়ে দেখতে পাই। এতে সন্দেহ হচ্ছে, সে এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে। ওই ছেলেটি বখাটে প্রকৃতির ছিল। প্রায় সময় আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতো।
স্থানীয় কাজিরগাঁও এলাকার গ্রাম্য সর্দার আব্দুল কাদির বলেন, কে বা কারা এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে আমরা জানি না। তবে ঘটনার দিন শাহাজানের বাড়ির পাশে পানির ডোবা থেকে পুঁতে রাখা অবস্থায় ফাহমিদার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের আগে শাহাজান ও ঘটনার পরদিন তার মা বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। এতে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে। বিষয়টি সমাধান করার জন্য শাহাজানের চাচা ও ফুফু আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তারা বর্তমানে কোথায় আছে সেটা পুলিশ কিংবা এলাকার লোকজন কেউই জানে না।
টিলাগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল মালিক ফজলু বলেন, ঘটনার দিন সকালে ১০টায় জানতে পারি ফাহমিদার লাশ ডোবায় পাওয়া গেছে। সরেজমিনে সেখানে গিয়ে পুলিশকে বিষয়টি জানাই। আমরা কেউই অনুমান করতে পারিনি কিভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটিয়েছে। পরে তাৎক্ষণিক আমরা ধারণা করেছি কেউ না কেউ এমন ঘটনাটি ঘটিয়েছে। আমরা এখনও অপেক্ষা করছি ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পর পুলিশের ভূমিকা কী হয় সেটা জানার জন্য।
ইউপি সদস্য আরো বলেন, ফাহমিদার পরিবারের সন্দেহ ছিল পাশের বাড়ির ওই ছেলেটি এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে। যেহেতু ছেলে ও তার মা পলাতক রয়েছেন, সেহেতু তাদের সন্দেহের সঙ্গে আমাদের সন্দেহের মোটামুটি মিল রয়েছে। এখন পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করলে বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি জানা যাবে।
যোগাযোগ করা হলে কুলাউড়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো: আমিনুল ইসলাম বলেন, ঘটনার দিন একটি ডোবা থেকে ফাহমিদাকে মৃত অবস্থায় পায় তার পরিবারের লোকজন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পরে ভিকটিম ফাহমিদার বাবা আকমল মিয়া বাদী হয়ে অপমৃত্যুর এজাহার দেন। বর্তমানে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে। এখনো রিপোর্ট আসেনি। রিপোর্ট আসার পর মৃত্যুর মূল কারণ জানা যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com