নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশা কর্মীদের আজ কমলগঞ্জ ও কাল কুলাউড়া আ’লীগের সম্মেলন

ইমাদ উদ দীন॥ দীর্ঘদিন পর জেলার দুটি উপজেলায় সম্মেলন ও কাউন্সিল হচ্ছে । তাই নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশায় নেতাকর্মীরা । দীর্ঘ ১৫ বছর পর হতে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কুলাউড়া ও কমলগঞ্জ উপজেলার আওয়ামীলীগের সম্মেলন।
৯ নভেম্বর শনিবার কাউন্সিল ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে কমলগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের। অপরদিকে কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে কাল ১০ নভেম্বর (রবিবার) । সম্মেলন ও কাউন্সিলকে সামনে রেখে গেল ক’দিন থেকে পদ পদবীর প্রত্যাশায় তৎপর ছিলেন নেতারা । হঠাৎ নেতাদের এমন তৎপরতা আর কদর বাড়ায় সম্মেলন ও কাউন্সিল নিয়ে উজ্জীবিত দলের নিবেদীত প্রাণ কর্মীরা । সম্মেলনকে ঘিরে সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। এই দুই উপজেলায় সম্মেলনকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মাঝে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
কুলাউড়াঃ
জেলার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতন উপজেলা হিসেবে খ্যাত কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামীলীগে দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ প্রকট । এই দ্বন্ধের কারনেই বিগত ইউনিয়ন,পৌরসভা,উপজেলা ও সংসদ নির্বাচনেও সুফল পায়নি আওয়ামীলীগ । দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনটি হাতছাড়া হয় আওয়ামীলীগের । আর ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে দেশের মধ্যে সর্বনিন্ম (প্রায় সাড়ে বারোশ) ভোট পাওয়ার রেকর্ড গড়েন আওয়ামীলীগের প্রার্থী এ্যাডভোকেট আতাউর রহমান শামীম । অথচ এই উপজেলা ভোট যুদ্ধে জেলার মধ্যে আওয়ামীলীগের অন্যতম দূর্গ হিসেবেই পরিচিত । এই রেকর্ডের নেপথ্যের কারন ছিল অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ । বয়ে চলা এ দ্বন্ধের কারনেই জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোট যুদ্ধে এই দূর্গটি হাত ছাড়া হচ্ছে আওয়ামীলীগের। আর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে সাংগঠনিক কাজে। দীর্ঘদিন থেকে একক নেতৃত্বের প্রভাব ক্ষোভে নিষ্ক্রিয় হচ্ছেন সক্রিয় নেতাকর্মীরা। তাই আগের চেয়ে এখন অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে সাংগঠনিক কার্যক্রম এমনটি বলছেন দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে চলমান এই দ্বন্ধ নিরসনে আসন্ন এই সম্মেলনই মূখ্য ভূমিকা রাখবে এমনটিই প্রত্যাশা তৃণমূলের কর্মীদের । দীর্ঘ ১৫ বছর পর কাল ১০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও কাউন্সিল। সম্মেলনকে ঘিরে সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। নেতাকর্মীদের মাঝে বইছে উৎসবের আমেজ। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীরা নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশা করছেন। গেল ক’দিন থেকে পদ পদবী প্রত্যাশীদের দৌঁড়ঝাপ ছিল তৃণমূল থেকে জেলা ও কেন্দ্র পর্যন্ত। নিজের পছন্দের প্রার্থীদের পক্ষে উপজেলা জুড়ে বিলবোর্ড ও ফেস্টুন টানানো হয়েছে।
জানা যায় গত ২৪ অক্টোবর পৌরসভা হলরুমে বর্ধিত সভায় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠনের মধ্যদিয়ে দীর্ঘদিন থেকে ঝিমিয়ে পড়া সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেকটাই চাঙ্গা হয়ে উঠে। ২০০৪ সালে ৭১ সদস্য বিশিষ্ট কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির অনেক দায়িত্বশীল পদের লোকজন মারা গেছেন। আবার অনেকেই বউ বাচ্চা নিয়ে প্রবাসে গেড়েছেন স্থায়ী নিবাস। যার কারনে বিগত কমিটির অধিকাংশ নেতাদের অংশগ্রহন নেই। তাই সময় উপযোগী এই সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পরপরই ডজন খানেক পদ পদবী প্রত্যাশী শীর্ষনেতাদের আশীর্বাদ পেতে এখনো জোর লবিং চালাচ্ছেন। পাশাপাশি তৃণমূলের নেতাকর্মী ও কাউন্সিলারদের সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রেখেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রচার প্রচারণায় সরগরম। আসন্ন সম্মেলন ও কাউন্সিলে পদ পদবীর জন্য যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন বর্তমান সভাপতি ও সাবেক (স্বতন্ত্র) এমপি আব্দুল মতিন, সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রেনু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুলাউড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ এ কে এম সফি আহমদ সলমান, উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমেরিকা প্রবাসী আব্দুল মুক্তাদির তোফায়েল, বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক ফজলু, সাবেক কুলাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের যুব বিষয়ক সম্পাদক আ স ম কামরুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামীলীগের দপ্তর সম্পাদক অধ্যাপক সিএম জয়নাল আবেদীন,উপজেলা শ্রমিক লীগের যুগ্ম আহবায়ক অধ্যক্ষ সিপার উদ্দিন আহমদ, উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি বদরুল ইসলাম বদর ও কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শফিউল আলম শফিসহ অনেকেই। তবে অন্যান্য পদে একজন বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন গোয়েন্দাসংস্থার তালিকাভুক্ত দলে অনুপ্রবেশকারীর নামও শোনা যাচ্ছে। জানা যায় এক সময় আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি কুলাউড়া ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ ছড়াতে থাকে। ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বচনে দলের সিন্ধান্তের বাহিরে গিয়ে স্বতন্ত্র হয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হন বর্তমান সভাপতি আব্দুল মতিন । এসময় তিনি দল থেকেও হন বহিস্কৃত। সৃষ্টি হয় তার নিজস্ব একটি বলয়। এমপি থাকাকালীন সময়ে তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম,দূর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠে। দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনের হলফ নামায় সম্পদ বিবরণীতে দেখা দেয় ব্যাপক গড়মিল । এমপি হওয়ার পর হয়ে উঠেন কয়েক কোটি টাকার সম্পদের মালিক। ওই ঘটনায় উপজেলা জুড়ে তখন চলে নানা গুঞ্জন আর আলোচনা সমালোচনা। একাদশ সংসদ নির্বাচনে অবশ্য নিজের জনপ্রিয়তা বুঝতে পেরে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে মহাজোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় ফিরে পান দলীয় পদ। ২১০৫ সালের পৌর নির্বাচন থেকে অনেকটাই প্রকাশ্যে দুই ভাগে বিভক্ত হয় উপজেলা আ’লীগ। সেই থেকে একাংশের নেতৃত্ব দেন উপজেলা আওয়ামীলীগ’র সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রেনু। অপরাংশের নেতৃত্ব দেন উপজেলা আওয়ামীলীগ’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ এ কে এম সফি আহমদ সলমান। তাদের দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে। উপজেলা আওয়ামীলীগ’র সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রেনুর বিরুদ্ধে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগের অন্তনেই। তিনি ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নানা সুবিধা নিয়ে নিজের মত করে দলীয় প্রার্থীর তালিকা প্রস্তুত করে তাদের মনোনীত করেছেন । আর্থিক উৎকোচের বিনিময়ে দলে অনুপ্রবেশকারীদের প্রার্থী মনোনীত করেছেন। তৃণমূলের মতামতের তোয়াক্কা না করে তার একক সিন্ধান্তে এসব প্রার্থী মনোনীত করায় সব ক’টি নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে দলীয় প্রার্থীর । এমনকি তিনি নিজেও ইউনিয়ন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর কাছে ধারাশায়ী হন।
অপরদিকে পৌরসভা নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধের কারনে অল্প ভোটে হেরে যান অধ্যক্ষ এ কে এম সফি আহমদ সলমান। এরপর উপজেলা নির্বাচনে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অনুরোধে দলীয় সিন্ধান্তের বাহিরে গিয়ে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। দলের সিন্ধান্তের বাহিরে গিয়ে নির্বাচন করায় সমালোচনায় পড়েন সলমান। অবশ্য দলের সভানেত্রী সাধারণ ক্ষমায় পার পেয়ে যান তিনি। তবে নেতাকর্মীদের তোলা অভিযোগ গুলি মানতে নারাজ এই দুই নেতা। তারা নিজেদের পক্ষে নানা যুক্তি তোলে ধরে নিজেদেরকে নির্দোষ দাবি করেন ।
কমলগঞ্জ:
এদিকে কমলগঞ্জে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে। সভাপতি পদে কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের সদস্য কমলগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান, অধ্যাপক রফিকুর রহমান,উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মোসাদ্দেক আহমেদ, সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ নুরুল ইসলাম, আলীনগর ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল হক, সাবেক চেয়ারম্যান আছলম ইকবাল,জেলা আওয়ামীলীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ছিদ্দেক আলী ও থানা আ’লীগ সদস্য আব্দুল মুনীম তরফদার। আর সাধারন সম্পাদক পদে জেলা আওয়ামীলীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক পিপি অ্যাডভোকেট এএসএম আজাদুর রহমান আজাদ, কমলগঞ্জ পৌর মেয়র ও উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক জুয়েল আহমেদ,মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের সদস্য অধ্যক্ষ হেলাল উদ্দিন,রহিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমদ,প্রভাষক হারুনুর রশীদ ভূঁইয়া,কমলগঞ্জ সদর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান,শমশেরনগর ইউপি চেয়ারম্যান জুয়েল আহমদ,পতনঊষার ইউপি চেয়ারম্যান তওফিক আহমদ,সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাব্বির আহমদ ভূঁইয়া, উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন,জুনেল আহমদ তরফদার,আব্দুল মালিক বাবুলসহ অনেকেই।



মন্তব্য করুন