বৈরী আবহাওয়া উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ উৎকন্ঠা চা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা

June 24, 2017,

ইমাদ উদ দীন॥ ভরা মৌসুমে বৈরী আবহাওয়া। ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। তাই এবছর আশানুরুপ উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ উৎকন্ঠায় চা শিল্পের লোকজন। এবছর মৌসুম শুরুর দিকে কয়েক সপ্তাহ অনূকুলে ছিল আবহাওয়া। তাই অনেকটা সম্ভাবনাও ছিল উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার। গেল বছর দেশে চা উৎপাদনে চা শিল্পের ১৩৬ বছরের রের্কড ভাঙ্গে। এবছর শুরুর দিকে এমন সম্ভাবনা আর স্বপ্ন ও প্রত্যাশায় উৎফুল্ল ছিলেন চা শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু হঠাৎ এমন সম্ভাবনায় পড়েছে ভাটা। কারন টানা ভারীবর্ষণ,অতিবৃষ্টি,উচ্চতাপমাত্রা আর মেঘলা আবহাওয়ায় নানা রোগবালাই আর মশার উপদ্রবের ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেল এমন আবহাওয়ায় বিরুপ প্রভাব পড়েছে দেশের চা উৎপাদনের অন্যতম অঞ্চল মৌলভীবাজারের চা বাগান গুলোতে। চা গাছ গুলোতে নতুন পাতা আসছে কম। আর যে গাছ গুলোতে পাতা আসছে তার মানও তেমন ভালো থাকছেনা। কারন মৌসুমের প্রথমদিকে খরা ও টানা ভারী বর্ষণ হওয়াতে চা গাছগুলো ধকল সামলে উঠার আগেই আবারও একই আবহাওয়া। তাই দুর্বল হয়ে পড়া চা গাছ গুলোতে নতুন পাতা (কুঁড়ি) কম আসায় বাড়ছে দুশ্চিন্তা। এবছর ভরা মৌসুমে বাগানগুলোতে আশানুরুপ চায়ের পাতা সংগ্রহ করতে না পারায় এখন অনেকটাই হতাশ মালিক,শ্রমিকসহ এ শিল্পের সংশ্লিষ্টরা। জেলার বেশ ক’টি চাবাগানের ম্যানেজারদের সাথে আলাপে তারা জানালেন বছরের তুলনায় এবছর এখন পর্যন্ত বাগান গুলোতে প্রায় ১৫%-২০% উৎপাদন পিছিয়ে রয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছা যাবে কিনা তা নিয়ে তারা সন্দিহান। তবে সময়ে সঠিক পরিচর্যা আর প্রতিকূল আবহাওয়া কাটিয়ে উঠলে উৎপাদনের পরিসংখ্যান ধরে রাখা সম্ভব বলে আশাবাদী চা গবেষকরা। এজন্য চা উৎপাদনের বিরুপ আবহাওয়ায় চা গাছগুলোর সটিক পরিচর্যা ও আরো অধিক যত্মশীল হওয়ার পরামর্শ তাদের। তথ্য মতে দেশে ১৬৬ টি চা বাগানের মধ্যে ১৪৫টি চাবাগানের অবস্থান সিলেটে। এর মধ্যে ৯২টি চা বাগানের অবস্থান মৌলভীবাজারে। এখনাকার পাহাড়ী টিলা,মাটি,ভৌগলিক অবস্থান আর আবহাওয়া অনূকুলে থাকায় অগ্রসর হচ্ছে এশিল্প। ধরে রাখছে তার ঐতিহ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নানা প্রাকৃতিক দূর্যোগ বিকাশমান এশিল্পের অগ্রযাত্রা অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে। সে জন্য এঅঞ্চলে চা শিল্পের অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে নানা ভাবে প্রাকৃতিক র্নিভরশীলতা কমানোর তাগিদ সংশ্লিষ্ট গবেষকদের। বাংলাদেশ চা বোর্ডের মহাব্যাবস্থাপক, চা ব্যাবস্থাপনা কোষ (নিউ সমনভাগ চা বাগান) মো: শাহজাহান আকন্দ বলেন এবছর চা উৎপাদনের ভরা মৌসুমে বৈরী আবহাওয়া যথেষ্ট প্রভাব ফেলবে। তাই কাঙ্খিত উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে।এমন প্রাকৃতিক দূর্যোগ আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে বিস্তর ফাঁরাক ঘটে। আবহাওয়ার এমন বির্বতন আমাদের জন্য আগাম সর্তকবার্তা। তিনি বলেন নানা কারনে এখন প্রকৃতির বিরুপ প্রভাব লক্ষ্যণীয়। তাই এই শিল্পের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে অতি প্রকৃতি নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। আর এজন্য চাবাগান গুলোতে নির্দিষ্ট ছায়াতরু,পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যাবস্থা,সঠিক সময়ে সঠিক ঔষধ,ঝোঁপ ঝাড় আর আগাছা পরিস্কার রাখা,সময় উপযোগী রুপন ব্যবস্থা,পর্যাপ্ত পানি সেচ ব্যবস্থা,মৌসুমের শুরুতে পোকামাকড় দমনে প্রতিষেধক ঔষধ ছিটানো, পরিমান মত সার ও বিশেষ কৌশলে চা গাছের গোড়ার যতœ নেওয়াসহ নানা পরামর্শ তার। জানা যায় এখন চলছে চা পাতা তুলার ভরা মৌসুম। বছরের এই সময়ে চা শ্রমিকরা হাতের মুঠি ভরে পাতা তুললেও এবছর ভিন্ন দৃশ্য। যে সময়ে একজন শ্রমিকের দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ কেজি পাতা তুলার কথা সেখানে একজন শ্রমিক ১৫/২০ কেজির উপরে পাতা তুলতে পারছেন না।

আর অনেক সেকশনে পাতা সংগ্রহের কাজও রয়েছে বন্ধ। জেলার কয়েকটি চা বাগানের চা শ্রমিকদের সাথে কথা হলে তারা জানালেন, বাগানে চা গাছগুলোতে মশা ও লাল মাকড়শা আক্রমণে নতুন পাতা গজাতে পারছেনা। তাছাড়া অনেক গাছ কারন ছাড়াই পাতা বির্বণ হয়ে ঝিমিয়ে পড়েছে। তারা জানান, এই সময়ে তাদের নিরিখ ৮৫ টাকা হাজিরার অনুকূলে ২৩ কেজি পাতা তুলার পরও তারা পাতা তুলতেন ৫০ থেকে ৬০ কেজি। অতিরিক্ত উত্তোলিত পাতার জন্য কেজি প্রতি ২-৪ টাকা হারে তারা দৈনিক দুই থেকে আড়াইশ টাকা আয় করেন। কিন্তু এই এবছর হঠাৎ এমন প্রাকৃতিক দূর্যোগে এখন তারা দৈনিক হাজিরার পাতাও তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ বিষয়ে হামিদিয়া চা বাগানের মহাব্যাবস্থাপক মো: সিরাজুল ইসলাম বলেন বৃষ্টি ছাড়া যেমন চা উৎপাদন সম্ভব হয়না তেমনি অতি বৃষ্টিও চায়ের জন্য ক্ষতিকর। অতিবৃষ্টিতে সেকশনের উপরের মাটি ধুয়ে উর্বরতা কমিয়ে দেয়। তাছাড়াও অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও চায়ের জন্য খুব ক্ষতিকর। তিনি জানান এবছর বাগান গুলোতে চা বাগানের মশা ও লাল মাকড়শা উপদ্রব কিছুতেই থামছেনা। ঔষধ ছিটিয়েও কোন উপকার পাওয়া যাচ্ছেনা। চা গাছের পাতা কালছে হয়ে মাটিতে ঝরে পড়ছে। এবছর চা মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি ছিল কম। পরে যে বৃষ্টি পাওয়া গেছে তা মাত্রারিক্ত। যা উপকারের চেয়ে ক্ষতি আশঙ্কাই বেশি। অতিবৃষ্টি হলে পানিবদ্ধতায় গাছের বাড়ার ক্ষমতা কমে যায়। আর ২৫-২৮ আর ডিগ্রী তাপমাত্রা হল চা গাছের জন্য সহনীয়। ২৮ ডিগ্রীর উপরে তাপমাত্রা হলে বিরুপ প্রভাব পড়ে। স্থানীয় আবহাওয়া অফিস সুত্রে জানা যায় এ বছর বেশিভাগ সময়ে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ছিল ৩২ থেকে ৩৯ ডিগ্রী সেলসিয়ারস। চলমান জুন মাসে প্রথম সাপ্তাহে তারা বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছেন ৩৩২ মিলিমিটার আর মে মাসে বৃষ্টি রেকর্ড করেছিলেন ৩৫৫ মিলিমিটার। এমন বৈরী আবহাওয়ার কারনে বাগান গুলোতে নতুন চা পাতার (কুড়ি) গজাতে পারেনী। এমন প্রতিকূল আবহাওয়াতে বাংলাদেশ চা গবেষনা কেন্দ্রেরের পরামর্শ থাকছে বাগানগুলোতে নিয়ম মাফিক পানি নিস্কাসন ও নিয়ম মত সটিক মাত্রায় ঔষধ ব্যবহারের। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে আবহাওয়ার এমন পরিস্থিতে চা বাগানে চায়ের মশা ও লাল মাকড়শা দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে। লাল মাকড়সার আক্রমনে গাছের পাতা লালচে হয়ে যায়। তখন পাতা যে পরিমান খাদ্য তৈরী করা কথা তা করতে পারেনা ফলে বন্ধ হয়ে যায় নতুন সুট। আর মশা পাতার সবুজ অংশ (মেন্টেইনেন্স লিপ) খেয়ে ফেলে। আর এমন প্রতিকূল আবহাওয়ায় বেড়ে চলে মশা আর পোকা মাকড়ের উপদ্রব। এম আর খান চা বাগানের সত্তাধিকারী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, বালিশরা ভেলীতে তার দুটি চা বাগানে (নন্দ রানী ও এমআরখান) কোন কারণ ছাড়াই সুট আসছেনা। অনেক সেকশনে মাকরসা বা মশার উপদ্রব নেই তবুও সুট নেই। তিনি বলেন জুড়ি ভ্যালিতে তার অন্য দুটি বাগানে নতুন পাতা আসলেও ওই বাগান দুটিতে পাতা না আসায় এবছর উৎপাদনে লক্ষমাত্রা অর্জন নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ টি এ্যাষ্টেট স্টাফ এসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মো: জাকারিয়া ও কোষাধ্যক্ষ মো: আমিনুর রহমান বলেন গেল কয়েক বছর থেকে দেশে চায়ের উৎপাদন অতীতের রের্কড ভেঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে। এটা এ শিল্পের সাথে জড়িতদের আশান্বিত করে।এবছর হঠাৎ আবহাওয়ার বিরুপ প্রভাবে ব্যাহত হচ্ছে চায়ের উৎপাদন। তবে আমাদের প্রত্যাশা এই প্রাকৃতিক দূর্যোগ কাটিয়ে উঠে এবছরও চায়ের উপাদন ভালো হবে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com