অসহায় দরিদ্র মানুষ ও কিছু নিবেদিত প্রাণ

স্টাফ রিপোর্টার॥ মৌলভীবাজার এমনই এক জেলা যেখানে বিত্তের আড়ালে ‘দরিদ্র’ থেকে যায় অন্তরালে। নিরবে সেইসব অসহায় মানুষগুলো দারিদ্রের কষাঘাত সয়ে যায়। স্বাদ-আহ্লাদ, শখ অধরাই থেকে যায় বেঁচে থাকার সংগ্রামে। বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে উৎসবে-পার্বনে। ঈদে নতুন কাপড় তো তাঁদের কাছে এক স্বপ্নের নাম। কিংবা ছেলেমেয়েকে স্কুল-কলেজে ভর্তি করবে, কেউ অসুস্থ হলে ভালো চিকিৎসা করাবে সে সুযোগ খুবই কম। গ্রামে বিত্তবান খুব বেশি একটা নেই বলে হাতার পাতার জায়গা রুদ্ধ বলা চলে- এমন গ্রামও আছে। আর হাতেগোনা যারা শহরে কিংবা প্রবাসে আছেন তাঁরা, এসবের খুব বেশি একটা খোঁজও নেননা। যে কারণে গ্রামের এসব দরিদ্র মানুষ আর তাঁদের সন্তানেরা বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকেন ঈদের নতুন জামার জন্য। বছরে একটু ভালো খাবারের জন্য। সেটা কখনও হয়, আবার অধিকাংশ সময় হয়না।
এসব অসহায়, দরিদ্র মানুষে জন্য এগিয়ে এসেছেন কিছু তরুণ। কোনো বড় প্রতিষ্ঠান কিংবা কোম্পানি নয়। কিংবা ধনাঢ্য ব্যক্তিও নয়। নেই রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক অভিলাস। স্রেফ মানুষের জন্য ভালোবাসা আর মানবিকবোধ থেকে ব্যক্তি উদ্যোগে অসহায় দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ান তরুণ রুমন মজুমদার। পেশায় ক্রিকেট কোচ ও ক্রীড়া সংগঠক।
গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এ বছরও তিনি কাগাবলা ইউনিয়নের আথানগিরি এবং আমতৈল ইউনিয়নসহ কয়েকটি এলাকার ৫০০ দরিদ্র মানুষদের জন্য ঈদের লুঙ্গি, শাড়ী, পাঞ্জাবি বিতরণ করেন। নিজের খুব বেশি একটা টাকা-পয়সা নেই। ঈদের জন্য নিজের জমানো টাকা আর বন্ধু, বড় ভাই, কাছের ঘনিষ্ঠ্ ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে সহয়তা নিয়ে নেমে পড়েন মাঠে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌছে দেন ঈদের নতুন জামা-কাপড়, রোযার জন্য খাদ্য সামগ্রী কিংবা গৃহ নির্মাণের জন্য ঢেউটিন। চিকিৎসা কিংবা স্কুল কলেজে ভর্তি, বা বই কেনার জন্য টাকা সংগ্রহ করে দেয়ার চেষ্টা করেন।

রুমন বলেন, ‘বলা হয়ে থাকে মৌলভীবাজার প্রবাসি অধ্যুষিত ধনী এলাকা। বাতির নীচেও অন্ধকার থাকে। সদর উপজেলায়ই অনেক ইউনিয়ন ও গ্রাম রয়েছে- যেখানে অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র সীমার নীচে বাস করে। ঈদে নতুন কাপড় কেনারও সামর্থ্য নাই। রোযা মাসে সেহরি-ইফতারে ভালো-মন্দ খাওয়ার তৌফিকও নেই। গ্রামে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল মানুষ কম থাকায় হাত পাতারও জায়গা নাই। এরমধ্যে কাগাবলা ইউনিয়ন, নাজিরাবাদ ইউনিয়ন, আমতৈল ইউনিয়ন অন্যতম।’
‘গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এ বছরও আমরা দারিদ্রপীড়িত অঞ্চল কাগাবলা ইউনিয়নের আথানগিরি এবং আমতৈল ইউনিয়নসহ কয়েকটি এলাকার ৫ শতাধিক দরিদ্র মানুষদের জন্য ঈদের লুঙ্গি, শাড়ী, পাঞ্জাবি বিতরণ করেছি। সাধ্যমতো কিছু গৃহহীনদের মধ্যে ঢেউটিন দেয়ার ব্যবস্থা করেছি। বেশ ক’বছর আগে থেকে আমরা ছোট্ট পরিসরে অনেকটা নীরবে কাজটা শুরু করি। মাঝে আমরা মৌলভীবাজার কারাগারে দরিদ্র বন্দিদের মধ্যে ঈদের পোষাক বিতরণ করি। আর আমার এই উদ্যোগে অনেক তরুণ বড় ভাইদের সাথে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন সাংবাদিক হাসানাত কামাল।’
রুমন বলেন, আমদের উদ্যোগ দেখে অনেকেই স্বতস্ফুর্তভাবে এগিয়ে এসেছেন আর্থিক সহায়তা দিয়ে। প্রতিবছরই তাঁরা সহেযাগিতা করেন। এ বছরও বাংলাদেশ ছাড়া ব্রিটেন, আমেরিকাসহ প্রবাসে থাকা বন্ধু, বড় ভাই ও ছোট ভাইয়েরা অর্থ পাঠিয়েছেন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।’
এ বছরও যারা অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন তাঁদের নাম বলতেই হয়। ম্লৌভীবাজার শহরের অন্যতম ব্যবসায়ী হাসিব হোসেন খান বাবু। যুক্তরাজ্য থেকে সংগ্রহ করে টাকা পাঠিয়েছেন মুছলেহ উদ্দিন মান্না। আরো সহযোগিতা করেছেন দেওয়ান শরীফ, ফজলুল করিম সুইট, রাফি, রাসেল। যুক্তরাষ্ট্র থেকে টাকা পাঠিয়েছেন এনামুল ইসলাম এনাম, কামরুল, রনি, বকশি মামুন, ফয়সল রনি, রেজা ও রাফি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সৈয়দ পলি। দেশ থেকে সহযোগিতা করেছেন মাহবুব মোর্শেদ, ইঞ্জিনিয়ার রাহেদ, ইঞ্জিনিয়ার তাসনিম, সেলিনা আলাউদ্দিন, আলী আহমদ, ফয়জুর রহমান, জাহেদ চৌধুরী, রাসেল আহমদ, আব্দুল কাইয়ুম জাবেদ, সাব্বির জয়, খোকন, রিপন, জিসান প্রমুখ।
রুমন বলেন, ‘আমাদের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। চেষ্টা থাকবে আগামীতে আরো বড় পরিসরে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। সেক্ষেত্রে আমাদের বন্ধুদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে আশা করছি।’



মন্তব্য করুন