নারী চা শ্রমিকের হত্যার রহস্য উদঘাটন : তিন শিশু সন্তানের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক আবেদন ওসির

প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ॥ মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আলীনগর চা বাগানের ১০ নং লাইন (পাক্কা লাইন) এর শ্রমিক বস্তির নারী শ্রমিক দিপালী রায় (৪০) এর রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। ২৫ আগস্ট রোববার মৌলভীবাজার আদালতে নারী চা শ্রমিক হত্যার কথা স্বীকার করেছে আলীনগর চা বাগানের মৃত সিকান্দর আলীর ছেলে চা শ্রমিক ইসহাক মিয়া (৪০)। দিপালী নায়েক প্রান্তিক লেভেলে বসবাস কারী একজন চা-শ্রমিক। তাহার দুই মেয়ে স্মৃতি নায়েক (১৩) ও বিরতী নায়েক (৩) এবং ছেলে বিশ্বজিৎ নায়েক (৭) নিয়ে দিপালীর পরিবার। দিপালীর এক কক্ষের বসত ঘরে একটি খাট ছাড়া উল্লেখ করা মত তেমন কিছু নাই। গত দুই বছর পুর্বে দিপালীর স্বামী সরতু নায়েক যক্ষা রোগে মারা যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর দিপালী নায়েক চা-বাগানে কাজ করে সপ্তাহ অন্তে প্রায় ছয়শত টাকা রোজগার করে কোনমতে সংসার চালাতো। দিপালী নায়েকের এতিম তিন শিশু সন্তানের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবেগঘন মানবিক আবেদন জানান কমলগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) সুধীন চন্দ্র দাশ।
কমলগঞ্জ থানা সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার ভোরে আলীনগর চা বাগানে নারী চা শ্রমিক তিন সন্তানের জননী দিপালী রায়কে নিজ ঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনাটি রহস্যজনক ভেবে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মরদেহ মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। গোপানে পুলিশি তদন্ত শেষে শুক্রবার রাতে একই চা বাগানের চা শ্রমিক ইসহাক মিয়াকে পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে রোববার সকালে মৌলভীবাজার আদালতে প্রেরণ করলে সে ১৬৪ ধারায় জবানবন্ধী দিয়ে নারী চা শ্রমিককে হত্যায় দায় স্বীকার করেছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কমলগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) সুধীন চন্দ্র দাশ বলেন, আদালতে আসামী স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, ঐ নারী চা শ্রমিকের সাথে তার অবৈধ সম্পর্ক ছিল। সম্প্রতি নারী চা শ্রমিক আরও পুরুষের সাথে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তোলায় গত বৃহস্পতিবার রাতে তাকে পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করেছে। মৃতের গলায় আঘাতের (রশির) দাগ ছিল। এরপর থেকে শুরু হয় হত্যার রহস্য উদঘানের জন্য পুলিশী তদন্ত।
কমলগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) সুধীন চন্দ্র দাশ আরো বলেন, মৌলভীবাজারের সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সার্কেল) আশরাফুজ্জান, কমলগঞ্জ থানার ওসি আরিফুর রহমান এর সার্বিক সহায়তায় দিপালী নায়েকের হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনের জন্য তাহার ছেলে, মেয়েকে আলীনগর চা-বাগানের অফিসে নিয়া বিভিন্ন পন্থায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মৃত দিপালী নায়েকের ছেলে-মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদের ফাঁকে ফাঁকে মনে হয়েছিল অজ্ঞাত নামা আসামীরা দিপালী নায়েককে হত্যা করে হয়তো সংসার যন্ত্রনা থেকে তাহাকে মুক্তি দিয়েছে, কিন্তু তাহার রেখে যাওয়া সন্তানরা কিভাবে বেঁচে থাকবে? তাদের যে জীর্ন পোষক শ্বীর্ন দেহ। কত দিন যাবৎ যে তাহারা ভাল খাবার খায়নি, মাথায় তেল সাবান দেয়নি? তাদের নিকট থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি যাচাই বাচাই এবং বাগানের আনাচে-কানাচে হইতে তথ্য সংগ্রহ জন্য মাঠে নামে কমলগঞ্জ থানার চৌকস পুলিশ টিম (এসআই চম্পক দাম, এ এসআই আব্দুল হামিদ, এএসআই উত্তম কৈরীসহ আরও)। পুলিশি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিভিন্ন উৎস হইতে প্রাপ্ত তথ্যের শুরু হয় চুলছেড়া বিশ্লেষণ। অত:পর আলীনগর চা-বাগানের চা-শ্রমিক ইছাক মিয়া (৪০). পিতা-মৃত সিকান্দর মিয়া গ্রেফতার হয়। বিভিন্ন কৌশল ও বিজ্ঞান ভিত্তিক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে স্বীকার করে লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের নির্মম কাহিনী। ।
চা-বাগানে হাজির হইয়া স্মৃতি নায়েক, বিরতী নায়েক ও বিশ্বজিৎ নায়েকে তাদের মা এর হত্যাকারীকে গ্রেফতারের সংবাদ জানালে তাদের মুখে শত কষ্টের মধ্যে ও এক নির্মল হাসি দেখতে পান।
বাংলাদেশের প্রচলিত বিচারে হত্যাকারী ইছাক মিয়া (৪০) এর শাস্তি হবে। কিন্তু পিতা-মাতাহীন এতিম ছেলে-মেয়েদের বেঁচে থাকবে কিভাবে? অনেকই হয়তো বলেতে পারেন, মেয়েটি (স্মৃতি নায়েক) স্থানীয় কামুদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেনির ছাত্রী। তার মায়ের মতো বাগানে কাজ করে পরিবারের হাল ধরবে। হ্যাঁ এটাই স্বাভাবিক কিন্তু আমরা কি পারি না এই এতিম বাচ্ছাদের জন্য কিছু করতে? বিষয়টি মনে হয় আমরা সবাই ভেবে দেখা উচিত। এ কথা উল্লেখ করে কমলগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) সুধীন চন্দ্র দাশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি আবেগঘন পোস্ট দেন। পুলিশ কর্মকর্তার মানবিক এই পোস্টে নারী চা শ্রমিক দিপালী নায়েকের ২ মেয়ে ও ১ ছেলের জন্য সকলের সহায়তায় ২/৩ লক্ষ টাকার একটি তহবিল গঠন, কমপক্ষে দশম শ্রেনি পর্যন্ত স্কুলে বেতনসহ অন্যন্য শিক্ষা উপকরনের ব্যবস্থা, ছোট ভাই ও বোনকে স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা গ্রহন, আগামী ৫ বছর তাদের বাগান কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে তাদের বসবাসের জন্য বাগানে ঘরে বিনা ভাড়ায় বসবাস করার জন্য প্রস্তাবনা ও মতামত তুলে ধরেন। এতিম তিনটি শিশু সন্তানের জন্য পুলিশ কর্মকর্তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবেগঘন পোস্ট দেখে অনেকেই সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। সমাজের বিবেকবান ও বিত্তশালীরা এগিয়ে আসলেই চা বাগানের তিন এতিম সন্তান সুন্দর আগামী পৃথিরী দেখতে পারবে।
কমলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা রেকর্ড হলে সে মামলার প্রধান আসামী ইসহাক মিয়াকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার ২২ আগস্ট দিবাগত রাতে আলীনগর চা বাগানের তার নাম দিপালী রায় (৪০) নাম নারী চা শ্রমিকের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল।



মন্তব্য করুন